বাংলাদেশে হাওরের সংখ্যা ৪১১, ৪৭৫ নাকি ৩৭৩?

বাংলাদেশের হাওরের সংখ্যা কি ৪১১, ৪৭৫ নাকি ৩৭৩; এই নিয়ে বড় ধরণের বিভ্রান্তির তৈরি হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরণের তথ্য দেওয়ায় আরও জটিল হয়েছে এই বিভ্রান্তি।

সিলেটপিডিয়ার জন্য সিলেট বিভাগের হাওর নিয়ে কাজ করছি আমরা। হাওরের তথ্য খুঁজতে গিয়ে মূলত সমস্যা সামনে এসেছে। যখন আমরা বিভিন্ন তথ্য নিয়ে গবেষণা শুরু করে ঠিক তখনই অসঙ্গতি সামনে আসতে থাকে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরণের তথ্য দিয়ে রেখেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকির হাওরের অবস্থান নিয়েও আছে ভুল তথ্য, ৫টি উপজেলা জুড়ে অবস্থান হলেও তথ্য বাতায়নে ২টি উপজেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

হাওর নিয়ে অসঙ্গতিগুলো যদি একটু মিলিয়ে নেই : সিলেট ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে কেবল সিলেট জেলায় (বর্তমানে সিলেট বিভাগ) ৩৫টি বড় হাওর এবং ৪৭৫টি ছোট হাওরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে বাংলাদেশে হাওরের সংখ্যা ৪১১টি। বাংলাদেশের জলাভূমির শ্রেণিবিন্যাস, ভলিউম ৩, পরিশিষ্ট ২: বাংলাদেশের হাওর, ডিসেম্বর ২০১৬ হাওরের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৩৭৩টি।


আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাই আপনার যে কোন একটি প্রতিষ্ঠানকে স্যান্ডার্ট ধরে কাজগুলো করুন। হাওরের সঠিক সংখ্যা উল্লেখ করুন। সাথে সাথে যদি বর্গ কিলোমিটার লিখতে হয় লিখুন না হয় হেক্টর। একেক জায়গায় একেক ধরণের তথ্য কাম্য নয় এ থেকে একটি প্রজন্ম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়বে ভুল তথ্য শিখবে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।


পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য মতে বাংলাদেশে হাওরের সংখ্যা ৪১১টি, যার মোট আয়তন ৮০০০ বর্গ কিলোমিটার। উক্ত বোর্ডের অপর একটি সূত্রমতে মোট হাওরের সংখ্যা ৩৯৫টি এবং হাওর এলাকার মোট আয়তন ২৪১৭ বর্গ কিলোমিটার। অপরদিকে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড-এর পরিচিতি ও কার্যক্রম সম্পর্কিত প্রতিবেদনে (মে/২০১০) হাওরের মোট সংখ্যা ৪১৪টি এবং হাওর এলাকার পরিমাণ ৭,৮৩,৯৩৯ হেক্টর উল্লেখ করা হয়েছে। সে মতে সুনামগঞ্জে ১৩২টি (২৪৯,৪১০ হে.), সিলেটে ৪৩টি (১১৫,১৮৩ হে.), মৌলভীবাজারে ৩টি (৩৭,৪১৪হে.), হবিগঞ্জে ৩০টি (৩৯,১৩২ হে.), ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩টি (১০,৫৮১ হে) কিশোরগঞ্জে ১২২টি (১৮২,১০৩ হে.) এবং নেত্রকোনায় ৮১টি (১৫০, ১১৬ হে)।”

এখানেও একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো কারণ একটি প্রতিষ্ঠান তাদের হাওরের আয়তনের ক্ষেত্রে হেক্টর হিসেবে দেখিয়েছেন আবার অন্য প্রতিষ্ঠান হাওরের আয়তনকে বর্গ কিলোমিটারের দেখিয়েছেন এখানে হেক্টর কিংবা বর্গকিলোমিটারের যে কোন একটি ধরলে পাঠকের কাছে তা সহজবোধ্য হতো এবং তথ্যের মধ্যে কোন ভুল বা অসঙ্গতি থাকলে তাও সহজেই অনুমান করা যেত।

অন্যদিকে সরকারি কিছু ওয়েবসাইটে নিজেদের কোন তথ্য নেই। বিচ্ছিন্নভাবে মাস্টারপ্ল্যান অব হাওর এরিয়া (বিএইচডব্লিউডিবি,২০১২) তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী-

ছকে উল্লেখিত তথ্যগুলোও যদি স্ট্যান্ডার্ড ধরে সরকারি সব প্রতিষ্ঠান একই তথ্য প্রদান করতেন তাহলে কিছুটা হলেও বিভ্রান্তি দূর হতো।


প্রথমেই আমরা হবিগঞ্জ জেলার হাওরগুলোর নাম ও সংখ্যা নিয়ে www.sylhetpedia.com ‘র জন্য একটা লেখা তৈরি করার জন্য কাজ শুরু করি। তখনই আমাদের সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। আমরা হবিগঞ্জ জেলা তথ্য বাতায়নের পটভূমি বিভাগ সার্চ করি কিন্তু সেখানে হবিগঞ্জ জেলার কোন হাওরের কথা উল্লেখ করা হয়নি। দায়সারাভাবে হবিগঞ্জ জেলার ভৌগলিক পরিচিতিতে ‘হবিগঞ্জ জেলার ভূ-তাত্বিক কাঠামো বাংলাপিডিয়া থেকে ইংরেজি একটি লেখা হুবহু তুলে দেওয়া হয়েছে যা কোনভাবেই কাম্য নয়।

জেলা ব্রান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে কয়েক জায়গায় শুধুমাত্র দু-একটি হাওরের নাম এসেছে কিন্তু সেখানে বিস্তারিত কিছুই লেখা হয়নি। অথচ হবিগঞ্জ জেলায় এই হাওরগুলোর অবদান কোন অংশে কম নয় এবং পর্যটন আকর্ষণের ক্ষেত্রে এই হাওরগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।

অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের কার্যালয় জেলার যে বিল, নদী ও হাওরের অংশবিশেষ বিভিন্ন সময় লিজ দিয়ে থাকেন সেক্ষেত্রে অবশ্যই সেখানে আপডেট তথ্য থাকার কথা। কোন লেখা যদি দেওয়া সম্ভব না হয় সেখানে শুধু হাওরগুলোর নাম লিখে রাখা যেত? অথচ সিলেট বিভাগের অন্য যে কোন জেলার অপেক্ষায় এই সব বিষয়ে কাজ আছে অনেক। বেশ কয়েকজন গবেষক এ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন নিয়মিত, তাদের সহযোগিতা নেওয়া যেত কিন্তু তা করা হয়নি!

সুনামগঞ্জ জেলার তথ্য বাতায়নের একনজরে বিভাগে গেলে সেখানে হাওর দিয়ে ওয়েবসাইটের কভার ছবি দেওয়া হলেও সেখানে হাওর সম্পর্কিত কোন তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় নি। এমনকি পটভূমি কিংবা একনজরে বিভাগের কোথাও হাওরের সংখ্যা কিংবা নাম উল্লেখ নেই। অথচ দেশে সুনামগঞ্জ জেলার পরিচিতি অনেকটা হাওরের জন্যই এবং এই জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস এই হাওর থেকে।

সম্প্রতি সুনামগঞ্জের হাওর-পর্যটন ক্ষেত্রেও বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। সুনামগঞ্জ জেলায় যে পরিমাণ পর্যটক ঘুরতে আসেন তার প্রায় ৯০ ভাগই আসেন হাওর দেখতে কিংবা নৌকার মধ্যে রাত্রিযাপন করতে।

সিলেট জেলার হাওরের তথ্য নিয়ে বেশ অসঙ্গতি আছে জেলা তথ্য-বাতায়নের ওয়েব সাইটগুলোতে। সিলেট জেলা ভৌগলিক প্রোফাইলে উল্লেখ করা হয়েছে ‘এই জেলায় ছোট বড় মিলিয়ে ৮২টি হাওর বিল রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সিংগুয়ার বিল ১২.৬৫ বর্গ কিমি, চাতলা বিল ১১.৮৬ বর্গ কি.মি. উল্লেখযোগ্য’। অন্যদিকে একনজরে সিলেট জেলায় একইভাবে উল্লেখ করা হয়েছে দুটি বিলের কথা, সেখানে কোন হাওরের কথা উল্লেখ করা হয় নি। অথচ মাস্টার প্ল্যান অব হাওর এরিয়া (বিএইচডব্লিউডিবি,২০১২) তথ্য অনুযায়ী জেলায় হাওরের সংখ্যা মোট ১০৫টি।

মৌলভীবাজার জেলায় হাওরের সংখ্যা কম হলেও সেখানে অনেক বিভ্রান্তিমূলক তথ্য আছে। মাস্টারপ্ল্যান অব হাওর এরিয়া (বিএইচডব্লিউডিবি, ২০১২) মৌলভীবাজার জেলার তথ্য অনুযায়ী জেলায় হাওরের সংখ্যা মোট ৩টি। আবার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ি মৌলভীবাজার জেলার হাওরের সংখ্যা ৪টি।

জেলা তথ্য বাতায়নে যদিও তিনটি হাওরের নাম কিন্তু আলাদা করে কোন আয়তনের কথা উল্লেখ করা হয়নি। আবার হাকালুকির হাওর নিয়ে অবস্থানগত ভুল তথ্য দেওয়া আছে তথ্যবাতায়নে। সেখানে কুলাউড়া ও বড়লেখা উপজেলায় অবস্থান বুঝানো হয়েছে অথচ ৫টি উপজেলা ও ১১ ইউনিয়ন নিয়ে হাওরটির অবস্থান। এছাড়া একটি উপজেলার নামও ভুল বানানে লেখা হয়েছে।

বাংলাপিডিয়া তাদের লেখায় উল্লেখ করে ‘হাকালুকি হাওরের আয়তন ১৮১.১৫ বর্গ কি.মি.। হাওরটি ৫টি উপজেলা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে বিস্তৃত। হাওরের ৪০% বড়লেখা, ৩০% কুলাউড়া, ১৫% ফেঞ্চুগঞ্জ, ১০% গোলাপগঞ্জ এবং ৫% বিয়ানীবাজার উপজেলার অন্তর্গত।’

সিলেটপিডিয়ার পক্ষ থেকে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানাই আপনার যে কোন একটি প্রতিষ্ঠানকে স্যান্ডার্ট ধরে কাজগুলো করুন। হাওরের সঠিক সংখ্যা উল্লেখ করুন। সাথে সাথে যদি বর্গ কিলোমিটার লিখতে হয় লিখুন না হয় হেক্টর। একেক জায়গায় একেক ধরণের তথ্য কাম্য নয় এ থেকে একটি প্রজন্ম বিভ্রান্তির মধ্যে পড়বে ভুল তথ্য শিখবে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

  • শাহাবুদ্দিন শুভ। সম্পাদক, সিলেটপিডিয়া।