প্লাবিত মৌলভীবাজারের নতুন নতুন এলাকা, দুর্ভোগ চরমে

মৌলভীবাজারে মহাসড়ক ভেঙে কুশিয়ারার পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। বাড়ছে হাকালুকি, কাউয়া দিঘী ও হাইল হাওরের পানি। প্রধান প্রধান হাওরের পানি বেড়ে কুলাউড়া জুড়ী, বড়লেখা, রাজনগর, মৌলভীবাজার সদর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অন্তত ২৫টি ইউনিয়নে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

পুরো জেলায় পানিবন্দি লোকের সংখ্যা এখন ৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি বন্যা কবলিত এলাকায় সরকারি ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল বলে জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। ফলে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে ৩ লক্ষাধিক পানিবন্দি মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গোচারণ ভূমি তলিয়ে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের সংকট।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খলিলপুর ইউনিয়নের স্থানীয় জনসাধারণ জানায়, বুধবার (২২ জুন) বিকেলে ইউনিয়নের হামরকোনা নামক স্থানে ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়কে বিশাল ভাঙন দেখা যায়। এই ভাঙন দিয়ে প্রবল বেগে কুশিয়ারা নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। স্থানটি সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মিলনস্থল হওয়ায় কুশিয়ারা নদীর পানি খলিলপুর ইউনিয়ন হয়ে আবার হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলায় যাচ্ছে।

মৌলভীবাজার সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জিয়া উদ্দিন জানান, শেরপুর এলাকায় অনেক স্থানে কুশিয়ারা নদীর বাঁধ ভেঙে এবং ওভার ফ্লো করে খলিলপুর ইউনিয়নে ঢাকা সিলেট পুরাতন সড়কের ভেতরে পানি জমে ছিলো। এই পানির বেগে বুধবার বিকেলে খলিলপুর ইউনিয়নের হামরকোনা নামক স্থানে ঢাকা সিলেট পুরাতন মহাসড়কে ভাঙন দেখা দেয়। পরে পানির প্রবল তোড়ে তা বেড়ে এখন অন্তত ৬০ ফুট বিস্তৃত হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ভাঙন বেড়ে না যাওয়ার জন্য সড়ক বিভাগের লোকজন চটের বস্তায় মাটি ভরে ভাঙনের দুই পাশে দিচ্ছেন।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা রহমান বাঁধন জানান, শেরপুর এলাকায় সড়ক বিভাগের পুরাতন রাস্তা ভেঙে কুশিয়ারা নদীর পানি হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার দিকে যাচ্ছে। তবে হাইল হাওরের পানি বেড়ে আমতৈল, কনকপুর, খলিলপুর ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।

তিনি জানান, বৃহস্পতিবার বিকাল পর্যন্ত সদর উপজেলায় ৯টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে।

কামালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আপ্পান আলী জানান, মৌলভীবাজারে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আরও ৩২টি ঘরে কোমর পর্যন্ত পানি উঠেছে। তিনি বলেন, এসব ঘরের লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে।

খলিলপুর ইউনিয়নের স্থানীয় লোকজন জানান, ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগ্রাম, শেরপুর মুক্তিনগর (নতুনবস্তি), হামরকোণা এই ৪টি গ্রামের অন্তঃত হাজার খানেক পরিবার পানিবন্দি রয়েছেন। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন স্থানে নির্মাণাধীন ঘরবাড়িতেও পানি উঠেছে। হাওরের পানি বেড়ে বহু পরিবার শেরপুর আজাদ বখত উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, শামসুন্নাহার বিদ্যাপীঠসহ বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে।

কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, হাকালুকি হাওরের মধ্যবর্তী এই ইউনিয়নের সবকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানি এখনো বাড়ছে।এখন নলকূপগুলো তলিয়ে যাওয়ায় বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে।

তিনি আরও জানান, তার ইউনিয়নের বন্যা কবলিত মানুষের মাঝে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হলেও অনেক অসচেতন লোক এগুলো দিয়ে পানি খেতে চায় না। তারা দূষিত পানি পান করে পানি বাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

এদিকে হাকালুকি হাওরের পানি বেড়ে কুলাউড়া-বরমচাল রেলওয়ে সেকশনে অন্তঃত ৫টি স্থানে রেল লাইনে পানি ওঠায় ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। রেল বিভাগ এসব স্থানে ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ করে এখনো ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রেখেছে বলে জানান সহকারী স্টেশন মাস্টার বাবু নামে সরকার।

বড়লেখা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মুদাচ্ছির জানান, বড়লেখার ১০টির মধ্যে ৯টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বড়লেখা উপজেলার সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ৭ নম্বর তালিমপুর ইউনিয়ন।

সেখানকার চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এখলাছুর রহমান জানান, তার ইউনিয়নের পুরো ৪০ হাজার মানুষ বন্যা কবলিত। তারা খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের সংকটে রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার ছাড়া আর কিছু দেওয়া হয়নি। সরকারিভাবে ৩ টন চাল বরাদ্দ করা হলেও পুরো ইউনিয়নের জন্য অন্তত ৫০ টন চালের প্রয়োজন রয়েছে ।

কুলাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার বাবু হরিপদ সরকার জানান, গত কয়েকদিন ধরে হাকালুকি হাওরে পানি বাড়ছিল। কিছু এলাকায় পানি রেল লাইনের উপরে উঠেছে। ফলে এসব স্থানে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও জানান, রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগ সেখানে অস্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি বসিয়ে ১০ কিলোমিটার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রেখেছে। আর পানি বাড়লে হয়তো ট্রেন চালানো সম্ভব না-ও হতে পারে।

এদিকে গত কদিনের বন্যায় মৌলভীবাজার জেলার ৭ উপজেলার ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজার জেলার ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মুহাম্মদ সামছুদ্দিন জানান, মৌলভীবাজার জেলার ৭ উপজেলায় ১১ হাজার ১৭১ হেক্টর জমির নতুন আউশ ধান,৩৬২ হেক্টর জমির বোনা আমন এবং ৮ শ’ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ দেড় কোটি টাকার কম হবে না।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার দপ্তরের ভেটেনারি অফিসার ডা. এ জেড এম ওয়াহিদুজ্জামান জানান, ৭ উপজেলার প্রাপ্ত রিপোর্ট অনুযায়ী এই বিভাগের ক্ষয়ক্ষতি ১ কোটি ১ লাখ ৩১ হাজার ৫০০ টাকা। ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে।

কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা ফেরদৌস জানান, কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকি হাওর এলাকায় ভুকশিমইল, বরমচাল, ব্রাহ্মণবাজার, ভাটেরা, জয়চন্ডী কাদিপুর, কুলাউড়া পৌরসভা ও সদর ইউনিয়নের বন্যা কবলিত এলাকায় শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী লোকজন জর সর্দি কাশি ও পেটের সমস্যায় ভুগছেন। আমরা তাদের স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিচ্ছি।

মৌলভীবাজার জেলার সিভিল সার্জন চৌধুরী জালাল উদ্দীন মুর্শেদ বলেন, বন্যাত্তোর স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলায় আমাদের ৭৫ টি মেডিকেল টিম মাঠে কাজে নেমেছে। তারা স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ জানায়, ৭ উপজেলার ৪২ ইউনিয়নের ৪০ হাজার পরিবার বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যায় ৩ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি ১ হাজার ৩০টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান জানান, মৌলভীবাজারে বন্যাকবলিত মানুষের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ৪৪০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ১৮ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৭০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণে কারও কোনো গাফিলতি পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।