সিলেটে হতে পারে যেসব দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা

সিলেট সিটি কর্পোরেশন ভবনের সামনে কোর্ট পয়েন্ট সংলগ্ন আলী আমজাদের ঘড়ির রেপ্লিকা কোনো শিল্পকর্ম নয়, একটি উদ্ভট কাণ্ড। এই জায়গা থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে ‘আলী আমজাদের ঘড়ি’ বহাল তবিয়তে আছে। তা সত্ত্বেও এখানে সেই ঘড়ির আদলে যা নির্মাণ করা হয়েছে, তা কোনো বিবেচনায় দর্শনীয়, দৃষ্টিনন্দন কিছু নয়। সর্বসাকুল্যে পাঁচ ফুট জায়গাকে পরবর্তীতে আবার ‘জনতার কামরান চত্বর’ নামকরণটাও অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। সিলেটের জননন্দিত সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের স্মৃতি স্মরণে এই স্থাপনাকে বরং ‘জনতার কামরান সৌধ’ বলা যেতে পারে।

নগরীর শিল্প-সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল রিকাবিবাজার পয়েন্টকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মরণে ‘নজরুল চত্বর’ ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে জাতীয় কবির একটি স্কেচের পাশে মার্বেল পাথরে খোদাই করে বিদ্রোহী কবিতার কয়েকটি চরণ আছে। এই চত্বরকে আরও নান্দনিক করার সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, নগরীর চৌহাট্টা পয়েন্টর মূল অংশে টিনের বেড়া। ট্রাফিক আইল্যান্ড হিসেবে যে অংশটুকু ব্যবহৃত হতো, সেখানে কিছু একটা হচ্ছে। কোনো একটি বেসরকারি ব্যাংকের অর্থায়নে কিছু একটা বানানো হবে। চৌহাট্টা চৌরাস্তার মোড় সিলেট শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। একপাশে ১০০ গজের মধ্যেই রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের গণকবর, শহীদ বুদ্ধিজীবী সমাধিস্থল, আমাদের সকল মুক্তির, প্রগতির ও অস্ত্বিত্বের প্রতীক কেন্দ্রীয় শহিদমিনার, অপর পাশে এই অঞ্চলের নারী শিক্ষাকে অগ্রগামী করার প্রথম উচ্চবিদ্যাপীঠ সিলেট সরকারি মহিলা কলেজ। অন্যপাশে মহান ভাষা আন্দোলনসহ নানা সংগ্রামের স্মৃতিবিজড়িত আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাস ও মাঠ। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নৃশংসতা ও বর্বরতার সাক্ষী শহীদ ডা. শামসুদ্দিন হাসপাতাল। চৌহাট্টা পয়েন্টের দুইপাশে রয়েছে সনাতন ধর্মীয় নাগরিকদের দু’টি ঐতিহ্যবাহী বাড়ি। একটি বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য সিংহ বাড়ি, অন্যটি বিজেন্দ্র কুমার দে সাহেবদের বাড়ি। চৌহাট্টা পয়েন্টকে ঘিরে কিছু হলে কী হবে? তা ঘোষিত নয়। সর্বজনীন কিছু একটা হবে, তা আশা করা যায়।

এই আশাবাদে বলা যায়, এই স্থানটি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে সম্পর্ক রেখে এমন কিছু নির্মাণ করা, যাতে কোনোভাবেই দৃষ্টিকে জোর করে নিবদ্ধ করতে হয় না। এসব বিবেচনায় চৌহাট্টা মোড়কে ‘ভাষা চত্বর’ করা যেতে পারে। এখানে বিভিন্ন ভাষার বর্ণমালা দিয়ে স্মারক নির্মাণ করা যেতে পারে। যা এই মোড়ের অবস্থান ও পারিপার্শিকতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এই পথ দিয়ে যেতে বা আসতে বাংলাদেশের প্রথম চা-বাগান মালনীছড়া দর্শন হয়। চায়ের দেশের প্রসারে পাতাকুঁড়ির কোনো স্থাপত্য হতে পারে। সোজাসুজি দু’টি পাতা, একটি কুঁড়ি দিয়েও চৌহাট্টা পয়েন্ট দৃষ্টিনন্দন করা যেতে পারে।

চৌহাট্টা থেকে আম্বরখানার দিকে এগোলে একপাশে পড়ে দরগাহ-ই-হযরত শাহজালাল (রহ) এর প্রবেশমুখ। আল্লাহতায়ালার নিরানব্বইটি নাম খচিত স্থাপত্য নির্মাণের একটি ইচ্ছে রয়েছে সিটি মেয়র জনাব আরিফুল হক চৌধুরী সাহেবের। এমন নির্মাণের জন্য বেছে নেওয়া যেতে পারে দরগাহ’র প্রবেশমুখটি। বিকল্প হিসেবে বলা যায়, বড় পরিসরে এই নির্মাণ সম্পন্ন করতে হলে আম্বরখানা জামে মসজিদকে মাথায় রেখে আম্বরখানায়, মীরের ময়দান মোড় বা শেখঘাট মোড়ে (মসজিদের পাশে) এটি করা যেতে পারে। তবে আল্লাহতায়ালার নিরানব্বইটি পবিত্র নাম অঙ্কিত টাওয়ার নির্মাণে বেসরকারি ব্যাংকের সুদের অর্থ যেন কোনোভাবে ব্যবহার করা না হয়। এমন ব্যবহার কোনভাবেই ইসলামী ভাবাদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।

বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে সিলেট নগরে প্রবেশ করার প্রাক্কালে চৌকিদেখি-লাক্কাতুরা এলাকায় একটি নান্দনিক তোরণ নির্মাণ করা যেতে পারে। সিলেট মহানগরীতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে কোনো স্থাপনা নেই। ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের স্থানান্তরিত জায়গায় উদ্যানের উদ্যোগ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সিলেট শাখার পক্ষ থেকে একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। বাপা’র পক্ষ থেকে পরিত্যক্ত কারাগারকে বঙ্গবন্ধু উদ্যান করার প্রস্তাব দেওয়া হলে সেই বৈঠকে উপস্থিত সিলেটের প্রাক্তন মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরানসহ উপস্থিত সকল প্রতিনিধিত্বশীল নাগরিক ঐক্যমত প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য যে, সিলেট নগরীর ধোপাদিঘিরপাড়ে ২৪.৬৭ একর ভূমির উপর ১৭৮৯ সালে তৈরি করা হয়েছিল এই কারাগার। প্রায় দুইশ বছর পূর্বের বাস্তবতায় নির্মাণ করা এই কারাগার বন্দিদের আধিক্যে ও নগর জীবনে সমস্যা সৃষ্টি করায় স্থানান্তর করা জরুরি হয়ে পড়ে। বিভিন্ন মহল থেকে কারাগার স্থানান্তরের দাবিও উঠতে থাকে। এ অবস্থায় ২০০৮ সালে আলোকিত সিলেটের স্বপ্ন নিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে আবুল মাল আব্দুল মুহিত কারাগার স্থানান্তর করে উক্ত স্থানকে উন্মুখ উদ্যান করার প্রতিশ্রুতি দিলে সর্বমহলে তা সমাদৃত হয়। সেই নির্বাচনে তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানকে পরাজিত করেন। কারাগার স্থানান্তর করা হলেও উদ্যান আর বাস্তবায়ন করা হয়নি।

এখন সিলেট মহানগরীর অন্তর্ভুক্ত না, তবে ভবিষ্যতে হবে- এই বিবেচনায় খাদিমনগর বাইপাস মোড়, দক্ষিণ সুরমা-কুমারগাঁও বাইপাস মোড়, পারাইরচকে জননেতা পীর হবিবুর রহমান চত্বর, চন্ডিপুলের জননেতা আব্দুস সামাদ আজাদ চত্বরকে সংস্কার করে এসব স্থানে ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরে শিল্পকর্ম স্থাপন করা যেতে পারে। সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও দেওয়ান ফরিদ গাজীর নামে নগরে দু’টি চত্বর নির্মাণ সময়ের দাবি। গণমানুষের কবি দিলওয়ার, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের উপদেষ্টা, জাতীয় অধ্যাপক সদ্যপ্রয়াত প্রকৌশলী জামিলুর রেজা চৌধুরী, সিলেট পৌরসভার নির্বাচিত প্রথম চেয়ারম্যান শ্রী রায় বাহাদুর দুলাল চন্দ্র দেবসহ নগরসংস্কৃতি ও নগর উন্নয়নে অবদান রাখা গুণীদের নামেও স্মৃতিফলক নির্মাণ করা যেতে পারে।

মনে রাখা দরকার, দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা পথচলতি মানুষের জন্য। এই নির্মাণে সুচিন্তার ছাপ থাকলেই পড়ে সুদৃষ্টি। নজর কাড়লে আরেকবার দেখার আশা জাগায়। এই শিক্ষা দেখা থেকে শেখার।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সিলেট।