অবৈধ যাত্রা : লিবিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ হবিগঞ্জের ৮ তরুণ

0
0

পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে ইতালি যাওয়ার কথা ছিল হবিগঞ্জের কলেজছাত্র সিদ্দিক আলীর। সেজন্য দালালের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার আগেই বিপদে পড়েন তিনিসহ হবিগঞ্জের আট তরুণ। এখন তাঁদের জিম্মি করে স্বজনদের কাছে মুক্তিপণ চাইছে লিবিয়া ও বাংলাদেশের একটি চক্র।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলেন, চক্রের সদস্যরা ওই তরুণদের বাড়ির মুঠোফোনে অডিও বার্তা ও কল দিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে দাবি করেছেন। অন্যথায় তাঁদের হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে বাংলাদেশি দালালের দাবি, তরুণেরা চক্রের হাতে নয়, বরং লিবিয়ার পুলিশ তাঁদের আটক করেছে।
একইভাবে হবিগঞ্জের আরও ৯ তরুণ আটক হয়েছেন। তাঁদের জীবনে কী ঘটেছে, কেউ জানে না। সপ্তাহখানেক আগে দালাল জানান, তরুণেরা লিবিয়ায় আটকা পড়েছেন। তবে তিনি কখনও পুলিশের হাতে, কখনো লিবিয়ার খারাপ লোকদের কাছে আটক হওয়ার কথা বলছেন। তাঁদের ছাড়াতে জনপ্রতি আরও সাড়ে তিন লাখ টাকা চেয়েছেন তিনি। এর পর থেকেই তাঁরা দুশ্চিন্তায় আছেন।

জিম্মি ওই আট তরুণ হলেন- বানিয়াচং উপজেলার পুকড়া ইউনিয়নের কাটখাল গ্রামের অমৃত মিয়ার ছেলে সিদ্দিক আলী (২৫), আবদুল মমিনের ছেলে মাসুম মিয়া (২৪), আবদুস শহিদের ছেলে রজব আলী (২৫), ধলাই মিয়ার ছেলে রুহুল আমিন (২৩), মুছিউর রহমানের ছেলে রুবেল মিয়া (২৫), আবদুল মতিনের ছেলে আবদুল হেকিম ওরফে ফয়সল (২৬), পুরান পাথারিয়া গ্রামের টেনু মিয়ার ছেলে নাইম মিয়া (২৪) এবং লাখাই উপজেলার কাটাইয়া গ্রামের সফিকুল ইসলামের ছেলে জসিম উদ্দিন (২২)।

একইভাবে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার আরও ৯ তরুণ লিবিয়ায় একটি চক্রের কাছে এখনও আটক আছেন বলে জানা গেছে।

তরুণদের স্বজনেরা জানান, তাঁদের কাছে গত এক সপ্তাহে লিবিয়া থেকে মুঠোফোনে কল করা হয়েছে ও অডিও বার্তা পাঠানো হয়েছে। সেখানে জানানো হয়, তরুণেরা লিবিয়া সীমান্তে আটকা পড়েছেন। তাঁদের একটি নির্জন বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের বার্তায় জিম্মি তরুণদের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেননি স্বজনেরা। তবে তাঁরা লিবিয়াতেই আছেন, সেটা মুঠোফোন নম্বর শনাক্ত করে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ফোন ও অডিও বার্তার পর আতঙ্কে দিন কাটছে স্বজনদের। এ বিষয়ে কার কাছে সাহায্য চাইবেন, ভেবে পাচ্ছেন না তাঁরা।

গত রোববার ক্ষুব্ধ তরুণদের স্বজনেরা লিবিয়ায় পাঠানো বাংলাদেশি দালাল কাটখাল গ্রামের আমির আলীর বাড়ি ঘেরাও করেন। তখন আমির আলী দাবি করেন, ওই তরুণদের পুলিশ আটক করে কারাগারে রেখেছে। তিনি তাঁদের ছাড়িয়ে আনবেন। এই প্রতিশ্রুতির পরপরই তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যান।

জিম্মি সিদ্দিকের বাবা অমৃত মিয়া জানান, তাঁর ছেলে হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজে স্নাতক পড়তেন। গ্রামের মকবুল মিয়ার দুই ছেলে ইতালিতে, এক ছেলে লিবিয়ায় ও বড় ছেলে আমির আলী (৫০) দেশে থাকেন। আমির আলী সম্প্রতি প্রচার করেন, তিনি ভাইদের মাধ্যমে ইতালিতে লোকজন নেবেন। অনেকেই তাঁর কথা বিশ্বাস করে টাকা জমা দেন।

অমৃত মিয়া আরও জানান, তাঁর ছেলে সিদ্দিককে ইতালি নিয়ে যেতে সাত লাখ টাকা দাবি করেন আমির আলী। গত ঈদুল ফিতরের দুইদিন পর তাঁর ছেলে ইতালির উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হন। সঙ্গে ছিলেন একই এলাকার আরও সাত তরুণ। আমির আলীর দাবি অনুযায়ী, লিবিয়া পৌঁছানোর আগেই তাঁকে জনপ্রতি চার লাখ টাকা দেওয়া হয়। পৌঁছানোর পর সেখান থেকে ইতালি নেওয়ার জন্য আরও তিন লাখ টাকা করে দেওয়া হয়। তখন তিনি অতিরিক্ত আরও এক লাখ টাকা বেশি দিতে বলেন। কারণ পথে তাঁর বেশি খরচ হয়েছে। তাঁরা সেটাও তাঁকে দেন। দিন দশেক আগে ছেলের একটি অডিও বার্তা পান তিনি। বার্তায় ছেলে লিবিয়ায় আটকা পড়ার বিষয়টি জানান। তিনি আমির আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানান, তাঁরা লিবিয়ার কারাগারে আছেন। চিন্তার কারণ নেই, আরও সাড়ে তিন লাখ টাকা দিলে তিনি ছেলেকে ছাড়িয়ে আনবেন।

অমৃত মিয়া বলেন, সপ্তাহখানেক আগে আমির আলী জানান, তরুণেরা লিবিয়ায় আটকা পড়েছেন। তবে তিনি কখনও পুলিশের হাতে, কখনও লিবিয়ার খারাপ লোকদের কাছে আটক হওয়ার কথা বলছেন। তাঁদের ছাড়াতে জনপ্রতি আরও সাড়ে তিন লাখ টাকা চেয়েছেন তিনি। এর পর থেকেই আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।

জিম্মি রজব আলীর বাবা আবদুস শহিদ জানান, দিন দশেক আগে ছেলের একটি অডিও বার্তা পান তিনি। বার্তায় ছেলে লিবিয়ায় আটকা পড়ার বিষয়টি জানান। তিনি আমির আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে জানান, তাঁরা লিবিয়ার কারাগারে আছেন। চিন্তার কারণ নেই, আরও সাড়ে তিন লাখ টাকা দিলে তাঁর ছেলেকে তিনি ছাড়িয়ে আনবেন।

বিদেশগামী আবদুল হেকিমের ভাই উজ্জ্বল মিয়া জানান, গত সোমবার রাতে তাঁর কাছে লিবিয়া থেকে বাংলা ভাষায় একজন লোক জানান, তাঁর ভাইকে কারাগার থেকে তিনি ছাড়িয়ে এনেছেন। এখন তাঁকে চার লাখ টাকা দিতে হবে। অন্যথায় তাঁর ভাইকে হত্যা করা হবে।

উজ্জ্বল বলেন, এ ধরনের বার্তায় আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছি। দালাল আমির আলী বলছেন, তারা কারাগারে আছে। অথচ গতকালের ফোনে মনে হয়েছে তারা কারাগারে নয়, কোনো অপরাধ চক্রের হাতে জিম্মি হয়েছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত আমির আলী বলেন, তিনি ও তাঁর প্রবাসী তিন ভাইয়ের মাধ্যমে ওই আটজনকে ইতালির উদ্দেশে পাঠানো হয়। লিবিয়ায় যাওয়ার পর পুলিশের হাতে ওই আট তরুণসহ কিছু লোক আটকা পড়েছেন। তাঁদের একটি জায়গায় আটকে রাখা হয়েছে। তিনি তাঁদের ছাড়িয়ে আনতে চেষ্টা করছেন। এ জন্য আরও টাকা প্রয়োজন। পরিবারগুলোকে এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে, কিন্তু তাঁরা সহযোগিতা না করে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে হেয় করছেন।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমরান হোসেন জানান, এখনও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কেউ তাঁদের কাছে অভিযোগ নিয়ে আসেননি। অভিযোগ পেলে পুলিশ এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেবে।

সূত্র : প্রথম আলো