‘রাজনীতিক ও আমলাদের যোগ সাজশেই বাড়ছে দুর্নীতি’

রাজনীতিক ও আমলাদের যোগ সাজশেই দুর্নীতি বাড়ছে, দুর্নীতি প্রতিরোধে এটা ভাঙতে হবে বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী।

তিনি বলেন, পলিটিশিয়ান ও প্রশাসনের লোকদের (আমলা) যোগসাজশে দুর্নীতি এখন দিন দিন বাড়ছে। এটা ভাঙতে না পারলে আমরা এগোতে পারব না।

দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে রোববার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর প্রধান কার্যালয়ে ‘জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ব্যবস্থাপনা: দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের প্রধান নিয়ামক’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে একথা বলেন তিনি।

বুয়েটের সাবেক শিক্ষক জামিলুর রেজা ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারে উপদেষ্টা ছিলেন। দুটি মন্ত্রণালয়ে ৮২ দিন দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, প্রশাসনে যারা থাকেন (আমলা) তারা কীভাবে মন্ত্রী পর্যায়ের লোকজনকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন, এই এক অভিজ্ঞতা আমার আছে। তারা কীভাবে ভুল পরামর্শ দিয়ে কোনো একটা ফাইল অনুমোদন করে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এটাকে ইংরেজিতে আমি বলি ‘নেক্সাস’।

পানামা পেপারস, প্যারাডাইস পেপারসে যে সব বাংলাদেশির নাম এসেছে, তাদের বিষয়ে দুদকের কোনো পদক্ষেপ না দেখার কথা বলেন জামিলুর রেজা। বিভিন্ন সময় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুদক জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা না নেওয়ার সমালোচনাও করে তিনি বলেন, অনেক সময় দেখা যায় প্রভাবশালী লোকদের ডেকে এনে দুদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তারপরে হঠাৎ থেমে যায়। কিন্তু ফাইনালি ক’জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো, এটা জানা যায় না।

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারে দায়িত্ব পালন করে আসা জামিলুর রেজা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের সম্পদের বিবরণী অনলাইনে উন্মুক্ত রাখার পক্ষে মত দেন। তিনি বলেন, যারা রাজনীতি করেন বা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তাদের অর্থনৈতিক বিবরণী অনলাইনে থাকা জরুরি। তাদের অর্থনৈতিক হিসাবগুলো সবসময় সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকা দরকার। যাতে এক নির্বাচন থেকে পরবর্তী নির্বাচনের মধ্যে কত টাকার সম্পদ বেড়েছে, সেটা জানা যায়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দীন খান বলেন, দুর্নীতি দমনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের বিদ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা অনুপস্থিত। জবাবদিহিতামূলক প্রশাসন গড়তে হলে সরকারি নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, বদলি, পদায়নে, শৃঙ্খলা এবং পদোন্নতির স্বচ্ছ এবং বৈষম্যহীন নীতিমালা প্রয়োজন।

সাবেক মন্ত্রী মিজানুর রহমান শেলী রাজনীতিকদের দুর্নীতিমুক্ত থাকার উপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের প্রাণ-ভোমরা হচ্ছে রাজনীতি। রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করতে না পারলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন অসম্ভব।

অনুষ্ঠানে দুদক চেয়ারমস্যান ও সাবেক সচিব ইকবাল মাহমুদ বলেন, আমলারা যদি চেয়ারের মায়া ত্যাগ করে আইনানুগভাবে তাদের সকল দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে কারও পক্ষেই দুর্নীতি করা সম্ভব নয়। ‘পদ্ধতিগত সংস্কার’ ছাড়া আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি নির্মূল করার খুব বেশি একটা সহজ পথ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

দুদক চেয়ারম্যান আরো বলেন, সব দুর্নীতিই দুর্নীতি দমন কমিশনের তফসিলভুক্ত অপরাধ নয়। মানিলন্ডারিং আইন ও দুদক আইন সংশোধনের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যক্তিবর্গের জাল-জালিয়াতি, প্রতারণা, অর্থ-পাচার সংক্রান্ত অপরাধসমূহ দুর্নীতি দমন কমিশন আইনে তফসিল বহির্ভূত করা হয়েছে। ফলে পানামা পেপারস কিংবা প্যারাডাইজ পেপারস দুর্নীতিতে যে সকল বেসরকারি ব্যক্তির নাম এসেছে তাদেরকে অনুসন্ধান করা কমিশনের জন্য কিছুটা জটিল বিষয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারপরও কমিশন জনগণের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে অবৈধ সম্পদ খোঁজার মাধ্যমে তাদের অবৈধ সম্পদ পাচারের বিষয়টি অনুসন্ধান করছে বলে তিনি জানান।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে দুর্নীতি হয় এবং এর মাধ্যমেই দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিকরণ হয়ে যায়।

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এ কে এম রহমতউল্লাহ বলেন, রাজনীতিবিদদের এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এরা সম্মিলিতভাবে কাজ করতে না পারলে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয়।

‘বন্ধ হলে দুর্নীতি, উন্নয়নে আসবে গতি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহের সমাপনী অনুষ্ঠানে বিএফইউজের সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান বুলবুলের সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানে সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ, অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ, অধ্যাপক জেরিনা জামান খান, অধ্যাপক আবুল কাশেম মজুমদার, সাংবাদিক সোহরাব হাসান, একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু, ব্যরিস্টার তানিয়া আমীর, দুদক কমিশনার নাসিরউদ্দীন আহমেদ ও দুদক কমিশনার এএফএম আমিনুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।