যুবলীগ নেতার মৃত্যুতে হকারশূন্য কাজির বাজার সেতু

প্রশাসনসহ সকলেই যখন চেষ্টা করে কাজির বাজার সেতুর উপর থেকে চটপটি-ফুচকাওয়ালাদের সরাতে পারেনি, তখন এক যুবলীগ নেতার মৃত্যুতে খালি হলো ‘সেলফি ব্রিজ’ খ্যাত কাজির বাজার সেতু। এখন আর সেতুর উপরে কোনো চটপটি-ফুচকাওয়ালা নেই।

উদ্বোধনের পর থেকে এ সেতুর দুই পাশে মানুষজন চলাচলের জন্য নির্মিত ফুটপাত পুরোটাই চটপটি-ফুচকাওয়ালারা। সেই সাথে রাস্তায় যান চলাচলের বেশিরভাগ জায়গাও দখলে নেয় তারা। এ অবস্থায় অনেকটা ঝুঁকির মধ্যেই ছিল সেতু দিয়ে হাঁটা এবং যান চলাচল। কিন্তু প্রশাসন ছিল নিরব দর্শকের ভূমিকায়।

সর্বশেষ গত ২৯ মার্চ রাতে দক্ষিণ সুরমা উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোসাদ্দেক হোসেন মুসা এ সেতুর উপর দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দুই দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে মারা গেলে টনক নড়ে পুলিশের। শুরু হয় ব্রিজ খালি করার কাজ।

জানা গেছে, ওই দিন কাজির বাজার ব্রিজের উপর দিয়ে মোটর সাইকেল চালিয়ে নগরীতে প্রবেশ করছিলেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা যুবলীগ নেতা মোসাদ্দেক হোসেন মুসা। এসময় কালবৈশাখী ঝড়ে একটি চটপটির দোকান উড়ে গিয়ে তার উপর পড়ে গেলে তিনি গুরুতর আহত হন। দুই দিন ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার অবশেষে তিনি মারা যান। তখন থেকেই পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় খালি করা হয় কাজির বাজার সেতু। তুলে দেওয়া হয় সব চটপটি ও ফুচকাওয়ালাদের।

নগরীতে যানজট নিরসনের লক্ষ্যে ১৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে শেখঘাট এলাকায় সুরমা নদীর উপর তৈরি করা হয় প্রায় ৪০০ মিটার দীর্ঘ দৃষ্টিনন্দন এ সেতু। প্রথমে ২০০৭-৮ অর্থ বছরে সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা থাকলেও সকল কাজ শেষ করে উদ্বোধন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় ২০১৫ সাল পর্যন্ত। উদ্বোধনের পর থেকেই সেতুর এ মোড় থেকে ও মোড় পর্যন্ত দুই পাশের ফুটপাত দখলে নেয় চটপটি-ফুচকাওয়ালা।

এদিকে শেষ বিকেলের মৃদু হাওয়া আর নয়নাভিরাম সূর্যাস্তের কারণে সেতুর উপর বাড়তে থাকে মানুষের সমাগম। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ে চটপটি-ফুচকাওয়ালাদের বেপরোয়া দখল তৎপরতা। তাদের দখলদারিত্বের কারণে জনসাধারণের দাঁড়ানোর জায়গাটাও হারিয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদ প্রকাশের পরও কোন কাজ হয়নি। বরং রাত হলে বিদ্যুৎ এর অবৈধ সংযোগ দিয়ে বাতি জ্বালিয়ে চলতো তাদের ব্যবসা। আর এসবের আড়ালে ছিলো বরইকান্দির জামান এবং শেখঘাট এলাকার সায়েম ও সুমনের নিয়মিত চাঁদা আদায়। সেই সাথে পুলিশের বিরুদ্ধে ছিলো তাদেরকে মদদ দেওয়ার অভিযোগ।

তবে বরইকান্দির জামালের রাজনৈতিক বা বিশেষ কোন পরিচয় না থাকলেও শেখঘাটের সাইমন এবং সুমন ব্যবহার করতেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সিকন্দর আলীর পরিচয়। তারা এ কাউন্সিলরের মানুষ পরিচয় দিয়েই নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ১২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. সিকন্দার আলী। তিনি বলেন, ‘২০০৩ সাল থেকে আমি এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন পোষা গুন্ডা ছিলো না, এমনকি এখনো নেই আর আগামীতেও থাকবে না। আমি সব সময় একা চলি। সুতরাং আমার নাম ব্যবহার করে কেউ এরকম কিছু করার সুযোগ নেই।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি নিজেও প্রায় সময় আমার পরিবার নিয়ে গিয়ে ফুচকা-চটপটি খেয়েছি। কিন্তু আমার নাম ব্যবহার করে কেউ টাকা আদায় করছে এটা একবারও কেউ বলেনি। যদি কেউ করেও থাকে তাহলে আমি জানলে ব্যবস্থা নিতাম। কারণ আমি সেই প্রথম থেকে এখন পর্যন্ত একই রকম আছি। এলাকার মানুষ আমার সম্পর্কে ভালো করে জানে, প্রয়োজনে আপনি নিজে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখুন আমি কি রকম মানুষ। সুতরাং এসব বিষয় কেউ করছে জানলে আমি তার আইনানুগ ব্যবস্থা নিতাম।’

এদিকে অভিযোগ আছে সেতুর মাঝখান থেকে দুই ভাগ করে বরইকান্দি অংশের চটপটি-ফুচকাওয়ালাদের কাছ থেকে জামান প্রতিদিন ১০০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করতেন। এছাড়া দক্ষিণ সুরমা থানার কদমতলী পুলিশ ফাঁড়ির বিরুদ্ধেও রয়েছে ৫০ টাকা করে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ। অপরদিকে শেখঘাট অংশের সকল দোকান থেকে কাউন্সিলর সিকন্দর আলীর পরিচয় দিয়ে সাইমন ও সুমন নামের দুজন ১৫০ টাকা করে আদায় করতেন। বিনিময়ে এসব দোকানীদের দেখভালের দায়িত্ব নিতেন তারা। পাশাপাশি কোতোয়ালী থানার লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়িও দোকান প্রতি ৫০ টাকা করে আদায় করতো বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে দুই অংশেই টাকা দেয়ায় প্রশাসনের থেকে তেমন কোনো ঝামেলা না পোহালেও জামান, সাইমন এবং সুমন এই তিনজনের জন্য ঝামেলা পোহাতে হতো দোকানীদের। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশাররফ হোসেনও। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এরকম টাকা আদায়ের কোন অভিযোগ আমার কাছে আসেনি। তবে একসময় তারা বসলেও এখন আমরা তাদেরকে বুঝিয়েছি যে, এখানে বসলে সেতুর সৌন্দর্য নষ্ট হবে। বলেছি যারা চটপটি-ফুচকা খায় তারা অন্যখানে বসলেও খাবে। সুতরাং সেতুর উপর না বসে তোমরা অন্যখানে বসো।’

যুবলীগ নেতার মৃত্যুর পর থেকে তারা সরেছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে কোতোয়ালী থানার ওসি বলেন, ‘আমার জানা নেই। আমি নতুন এসেছি। হতে পারে এরকম কোন কিছু। আমার মনে হয় রমজানের কারণে এতদিন বসেনি, তবে ঈদের পর তারা ২/৩ দিন বসেছিলো পরে আমরা তাদের ভালো করে বুঝিয়ে বলার কারণে আবার সরে গেছে।’

অন্যদিকে দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খায়রুল ফজল বলেন, তাদেরকে এখান থেকে তুলে দিতে প্রশাসনের তেমন একটা কাজ করতে হয়নি। এলাকাবাসী নিষেধ করায় তারা এখন আর বসে না। তবে টাকা আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন ওসি খায়রুল ফজল। তিনি বলেন, পুলিশের কেউ এরকম করতো বলে আমার জানা নেই। কিছু বাটপার আছে যারা হয়ত টাকা আদায় করে তাদেরকে বসাতো। কিন্তু এর সাথে পুলিশের কোন সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান তিনি।

কবে থেকে তারা এখানে আর বসছে না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ২/৩ মাস হবে তারা এখানে আর বসে না। যারা এখানে ব্যবসা করত তারা এ এলাকারই লোক। তাই এলাকবাসীর নিষেধেই তারা এখানে বসা বাদ দিয়েছে।

তবে যুবলীগ নেতা মুসার মৃত্যুর পর এসব চাঁদা বা কোন কিছুই কাজে আসেনি। সেতু ছেড়ে দিতে হয়েছে চটপটি-ফুচকাওয়ালাদের। স্থানীয় ছাত্রলীগের চাপে প্রশাসন বাধ্য হয়ে তাদের সেতুর উপর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে সেতুর উপর এখন অনেকটাই ফাঁকা। সেতুর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোন চটপটি-ফুচকার দোকান না থাকায় অনেকটা শান্তিতে সেতুর দুই পাশ ব্যবহার করছেন জনসাধারণ

শনিবার (৩০ জুন) বিকালে সরেজমিনে কাজির বাজার সেতু ঘুরে দেখা গেছে সেতুর উপর কোন চটপটি-ফুচকার দোকান নেই। সরেজমিনে সেতুর উপর কোন দোকান পাওয়া না গেলেও কাজির বাজার থেকে সেতুর শেষাংশের টেকনিক্যাল মোড়ের পাশে একটি খেলার মাঠে আছে কেবল একটি চটপটি-ফুচকার দোকান।

চটপটি দোকানি আউয়াল বলেন, ‘আগে সেতুর উপর থাকায় ব্যবসা ভালই হতো। কিন্তু এখন নিচে হওয়ায় উপর থেকে লোকজন আর নিচে নামতে চায় না। তাই ব্যবসা একেবারেই খারাপ।’ সেতু উদ্বোধনের পর থেকেই সেতুর উপর বসে ব্যবসা করে আসলেও কিছু দিন আগে যুবলীগ নেতা মুসার মৃত্যুর পর থেকে এলাকার লোকজন আর পুলিশ প্রশাসন মিলে তাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে সেতুর উপর কোন চটপটি-ফুসকার দোকান না থাকায় এ সেতু যেমন ফিরে পেয়েছে তার আসল সৌন্দর্য তেমনই ঘুরতে আসা সকলেই স্বাচ্ছন্দে সেতুর দুই পাশ ব্যবহার করছেন। এমনকি ঘুরতে আসা সকলেই ফাঁকা সেতুর উপর দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে সেলফি তুলতেও ভুল করছেন না। সেতুর দুই পাশে দাঁড়িয়ে নির্মল বাতাস আর নয়নাভিরাম সূর্যাস্তটা উপভোগ করছেন আগত সকলেই। এক সময় চটপটির দোকানের কারণে ফুটপাতের পুরোটাসহ মূল সড়কের কিছু অংশ দখলে থাকায় ঘুরতে আসা সকলেই হাঁটাচলায় ব্যবহার করতেন মূল সড়ক। ফলে সকলের কাছেই অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে হতো। কিন্তু চটপটি-ফুসকার কোন দোকান না থাকায় এখন এ ঝুঁকিও নেই।

সেতুর উপর ঘুরতে এসেছেন রায়নগরের বাসিন্দা আয়শা সিদ্দিকা। তিনি বলেন, শহরে কোথাও শান্তিতে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। এ সেতু উদ্বোধনের পর কিছুটা ফাঁকা থাকলেও সময়ে সময়ে এর দুই পাশে হাঁটাচলার সকল জায়গাই দখলে নেয়। কিন্তু বিগত কিছু দিন থেকে এখানে দোকান না থাকায় অনেক সুন্দর লাগছে। বিশেষ করে শান্তিতে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়েছে। সব সময় এরকম থাকলেই ভালো। তবে যে ভাবেই হোক দীর্ঘ দিন পর সেতুর দুই পাশ মুক্ত হওয়ায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন ঘুরতে আসা সকলেই। এমনকি সব সময় সেতুর উপর ভ্যানসশূন্য দেখার ইচ্ছাও পোষণ করেছেন।