ব্যর্থতার সাফল্য

জান্নাতুন নাঈম প্রীতি (লেখক)

কাকতালীয় হলেও সত্যি- এইচএসসি পরীক্ষার ‘তিন দশমিক আট শূন্য’ নামক ভয়াবহ খারাপ রেজাল্ট নিয়েও দেশ সেরা তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটি বিষয়ে চান্স পাওয়ার ক্ষেত্রে যে মোটামুটি অসাধ্য সাধন করেছিলাম তখন যে মানুষটি আমাকে সবচেয়ে বেশী অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন তাঁর নাম- হুমায়ূন আহমেদ!

হুমায়ূন আহমেদ যখন আমেরিকার নর্থ ডাকোটা ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন তখন প্রথমবার ফেল করেছিলেন। দেখা গেলো তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিচ্ছু বোঝেন না। আগেও কখনো পড়েননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়াসন বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর আলী নওয়াজ লিখে দিয়েছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে অল্প কয়েকজন মেধাবী ছাত্র তৈরি করেছে, নিঃসন্দেহে হুমায়ূন আহমেদ তাদের একজন। দেশের লোক মেধাবী ছাত্রের এই বেহাল অবস্থা জানলে কি হবে?

ওদিকে ওই কোর্সে সবচেয়ে বেশি মার্ক পেলো একজন অন্ধ ছাত্র। প্রথম টার্ম ফাইনাল শেষে হুমায়ূন আহমেদকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল- এবার দ্বিতীয় টার্ম ফাইনালে জিরো পেলে দেশে ফিরে যেতে হবে!
কাজেই হুমায়ূন আহমেদ জানপ্রাণ দিয়ে পড়লেন এবং দ্বিতীয়বার টার্ম ফাইনালে পেলেন ১০০ তে ১০০! সারা নর্থ ডাকোটা বিশ্ববিদ্যালয় জেনে গেলো- বাংলাদেশ নামের একটা দেশ থেকে এক বিচিত্র ছাত্র এসেছে, যে প্রথমবার শূন্য পেয়ে দ্বিতীয়বার পেয়েছে ১০০ তে ১০০!

এই পুরো সময়ে হুমায়ূন আহমেদের অনুপ্রেরণা ছিল সেই অন্ধ ছাত্রটি যে প্রথম টার্ম ফাইনালে হায়েস্ট মার্ক পেয়েছিল! হুমায়ূন আহমেদের কথা ছিল- একজন মানুষ চোখে দেখতে না পেয়েও হায়েস্ট পায়, তাহলে আমি কেন পাবোনা?

তাই আমি যখন ৩ দশমিক আট শূন্য পাওয়ার ভয়াবহ রেজাল্টটি করেছিলাম তখন আমার অনুপ্রেরণা ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ! শূন্য পাওয়ার পরেও হুমায়ূন আহমেদ কোয়ান্টাম মেক্সানিক্সের জটিল মতো বিষয় বুঝে ফেললেন আর আমি এই রেজাল্ট নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবোনা? এটা একটা কথা?
টানা দেড়মাসের হাড়ভাঙা খাটুনির পর আমি চান্স পেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে চান্স মোট আট বিষয়ে! তারপর ভর্তি হলাম নিজের পছন্দের চারুকলা বিভাগে।

-ভালো কথা, তোমাকে জানিয়ে রাখছি এইবছর বাংলাদেশের হয়ে ‘আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড’-এ সোনার মেডেল জেতা ছেলেটিও এইচএসসি পরীক্ষায় ‘গোল্ডেন এপ্লাস’ তো ভালো, ‘এপ্লাস’ই পায়নি! ভেবে দেখো- আজকের এপ্লাস না পাওয়া আগামীদিনে গণিত অলিম্পিয়াডে সোনার মেডেল পাওয়ার সম্ভাবনা!

এজন্য আজকাল কেউ যখন জিজ্ঞেস করে- জীবনে সফল হতে হলে কি করতে হবে? আমি তাকে মধুর গলায় বলি- তোমাকে হারতে শিখতে হবে! কারণ- তুমি যখন হেরে যাও, তখন তুমি হারো না। তুমি হেরে যাও কেবল- জেতার পরিশ্রম না করে হার মেনে নিলে! বুঝেছ?

  • জান্নাতুন নাঈম প্রীতি, কথা সাহিত্যিক।