বেলজিয়াম ফুটবলার লুকাকুর অবিশ্বাস্য উত্থান

এবারের বিশ্বকাপে তিনি খেলছেন অদম্য সিংহের মতোই। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত এ স্ট্রাইকার ক্লাব ক্যারিয়ারে বর্তমানে খেলছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে। তিনি ২৫ বছর বয়সী বেলজিয়ান ফুটবলার রোমেলু লুকাকু। তার জীবনকথায় এসেছে অবিশ্বাস্য উঠে আসার গল্প।

২০০৯ সালের ২৪ মে। আন্দেরলেখট আর স্ট্যান্ডার্ড লীগের মাঝে প্লে অব ফাইনাল চলছে। কোচ লুকাকুকে অনূর্ধ্ব ১৯ টিমের বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছেন। ওইদিন কোচের সঙ্গে বাজি ধরে বসলেন। বললেন, ‘যদি তুমি আমাকে খেলাও তাহলে কথা দিচ্ছি, ডিসেম্বরের মধ্যেই ২৫টা গোল দেব। না হলে তুমি আমাকে সারা জীবন সাইড বেঞ্চে বসিয়ে রেখ’। ক্রু’র হাসি হাসলেও কোচ তা মেনে নিলেন। এটা সম্ভবত পৃথিবীর কোনো মানুষের ধরা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

কী আশ্চর্য! নভেম্বরের মধ্যেই তিনি ২৫ গোল দিলেন! এই ঘটনা একটা শিক্ষা দেয়- ক্ষুধার্ত মানুষের সঙ্গে কখনই কোনো চ্যালেঞ্জ নয়।

১৯৯৩ সালের ১৩ মে উত্তর বেলজিয়ামের ছোট্ট শহর অ্যান্টর্পে এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন লুকাকু। তার বাবা রজার লুকাকু ছিলেন একজন পেশাদার ফুটবলার। পেশাদার হলে কী হবে, তার ক্যারিয়ার ছিল তখন পড়তির দিকে। পরিবারের সদস্যদের খাবার জোগানো তার পক্ষে ছিল ভীষণ দুঃসাধ্য। পড়াশোনার খরচ তো রয়েছেই।

ভরা যৌবনে রজার যা কিছু আয় করেছিলেন, সেগুলোই এখন একটু একটু করে নিঃশেষ হচ্ছে। ঘরের টিভি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল অভাবের তাড়নায়। আর এ কারণেই তার মাকে পানি মেশানো দুধ খাওয়াতে দেখে মাত্র ছয় বছর বয়সেই ছোট্ট লুকাকু বুঝতে পেরেছিল, তাদের পরিবারটি ডুবে যাচ্ছে দারিদ্র্যের গহিন সমুদ্রে।

বিদ্যুৎ বিল দিতে না পারায় অন্ধকারেই কাটাতে হতো মাসের অধিকাংশ দিন। ছোট্ট লুকাকু ওই ছয় বছর বয়সেই বুঝতে পারল, জীবনযুদ্ধে তাদের পরিবার লড়ে যাচ্ছে প্রাণপণে।

একদিন স্কুল থেকে ফিরে মাকে কাঁদতে দেখে বললেন, ‘সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে মা। তুমি দেখ, খুব শিগগিরই আমি আন্দেরলেখট ক্লাবে ফুটবল খেলব। আমরা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাব। তোমার আর কোনো দুশ্চিন্তা থাকবে না।’

বাবার কাছ থেকে ওই বয়সেই জেনে নিলেন, ১৬ বছর বয়স না হলে পেশাদার ফুটবল খেলা যায় না। কিন্তু তাতে কী! প্রতিজ্ঞার পথে তাকে তো এগিয়ে যেতেই হবে। শুরু হল তার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করার মিশন।

তিনি বলেন, ‘ওই সময় থেকেই আমি যত ম্যাচ খেলেছি সবই ছিল আমার কাছে ফাইনাল ম্যাচ। বলে শট করার সময় প্রতিটি শটে বলটিকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে চেয়েছি। শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে বলে লাথি দিতাম।’

তিনি সব সময়ই বেলজিয়ান ইতিহাসের সেরা ফুটবলার হতে চেয়েছেন। প্রচণ্ড রাগ নিয়ে তিনি প্রতিটি খেলায় অংশগ্রহণ করেছেন। খেলার সময় তার মাথায় থাকত, তাদের ঘরময় ইঁদুরেরা ছোটাছুটি করত। একটা টিভির অভাবে তিনি চ্যাম্পিয়নস লীগ দেখতে পারেননি।

মাত্র ১২ বছর বয়সে ৩৪ ম্যাচে ৭৬ গোল করেন লুকাকু। এই এতসব গোল বাবার জুতো পরেই করেছেন।

মাকে বলেছিলেন ১৬ বছর বয়সেই লীগে খেলে দেখাবেন। কিন্তু সেটা করতে তার ১১ দিন দেরি হয়ে গিয়েছিল। আন্দেরলেখটের হয়ে মাঠে নামলেন তিনি। দল হারলেও ম্যাচের ৬৩ মিনিটে বদলি হিসেবে নেমে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, বাজি জেতা এই ছেলের পক্ষেই সম্ভব।

পরবর্তী বছরটা আরও ভালো গেল। তার তখন হাই স্কুলের শেষ বছর চলছে। একই সঙ্গে ইউরোপা লীগেও খেলেছেন। স্কুলব্যাগ কাঁধে নিয়েই মাঠে চলে যেতেন। ওই বছর তারা লীগ শিরোপা জিতে যান। তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার ছিল, সেবারই তিনি বছরের সেরা আফ্রিকান খেলোয়াড় নির্বাচিত হন!

এরই মধ্যে দেশের হয়ে দুই বিশ্বকাপে নিজের পারদর্শিতার প্রমাণ দিয়েছেন। পেশাদার লীগে আন্দেরলেখটের পর চেলসি, এভারটন হয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের অপরিহার্য স্ট্রাইকার তিনি। লীগে ২৯৩ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ১৩৪। আর ২০১০ থেকে জাতীয় দলের হয়ে তিনি করেছেন ৪০ গোল।