বন্যায় ওসমানীনগর-বালাগঞ্জের অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত

উজান থেকে নেমে আসা ভারতের পাহাড়ি ঢল ও টানা ৪ দিনের বৃষ্টির পানিতে সিলেটের ওসমানীনগর-বালাগঞ্জে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি। ইতোমধ্যে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষ। দুটি উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রধান নদী কুশিয়ারার পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে।

কুশিয়ারা ডাইকের ২৯টি পয়েন্ট দিয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করায় প্লাবিত হয়েছে ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ উপজেলার প্রায় অর্ধশত গ্রাম।

গত রোববার ওসমানীনগরের কুশিয়ারা ডাইক ও বন্যা আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম, সাবেক সংসদ সদস্য ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, ওসমানীনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মইনুল হক চৌধুরী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান।

ঈদের দিন রাতে কুশিয়ারা ডাইকের সাদীপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর এলাকায় ভাঙনের ফলে বাঁধের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় মুহূর্তেই তলিয়ে যায় ইউনিয়নের অন্তত ১৫টি গ্রাম। এতে গ্রামগুলোর সহস্রাধিক পরিবারের মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন। ঈদের আগেই বন্যা কবলিত হয়ে পড়েন বৃহত্তর তাজপুর গ্রামের বাসিন্দারা। বিগত বছরগুলোর ন্যায় এবারের ঈদও ঠিকভাবে করতে পারেননি তারা।

এছাড়া পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নে কুশিয়ারা ডাইকের ৩টি স্থানে ভেঙে গিয়ে অন্তত ১০ গ্রামের ৫ শতাধিক পরিবারের লোক পানিবন্দী রয়েছেন। উমরপুর ইউনিয়নের বানাইয়া হাওরপারের আবদুল্লাপুর, ভরাউট, হামতনপুর গ্রামের ৪ শতাধিক পরিবারের লোকও হয়ে পড়েছেন পানিবন্দী।

স্থানীয়রা জানান, ওসমানীনগর উপজেলার সাদীপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর ও লামা তাজপুর গ্রামের ডাইকের কালভার্ট ভেঙে ডাইকের বিভিন্ন স্থান দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে প্রায় ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গ্রামগুলো হলো, লামা তাজপুর, পূর্ব কালনিচর, উত্তর কালনিচর, দক্ষিণ কালনিচর, সৈয়দপুর, সুন্দিকলা, ইসলামপুর, সম্মানপুর, চাতলপাড়, রহমতপুর, লামা তাজপুর, পূর্ব তাজপুর, দক্ষিণ তাজপুর ও নবীগঞ্জের গালিমপুর, মাধবপুর, রহমতপুর, সুন্দিখলা, চাতলপাড়, গোজাতলী, সম্মানপুরসহ আরও কিছু গ্রাম। ওসমানীনগর উপজেলার লামা তাজপুর গ্রামের নিকট কুশিয়ারা ডাইকের কালভার্ট ভেঙে বন্যার পানি ঢুকে এসব গ্রাম আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে অনেকেই বাড়ি-ঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন।

সাদীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুর রব বলেন, “ঈদের দিন সৈয়দপুর এলাকায় একটি কালভার্ট ভেঙে গেলে বাঁধের অন্তত ৪০ ফুট জায়গা ভেঙে যায়। এতে ১৫-১৬টি গ্রামের ১০ সহস্রাধিক লোক বন্যা কবলিত হয়ে পড়েন।

পশ্চিম পৈলনপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুর রব বলেন, “কুশিয়ারা ডাইকের ৩টি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়ায় ১০ গ্রামের ৫ শতাধিক পরিবারের লোক পানিবন্দী রয়েছেন।

ডাইক (বাঁধ) ভেঙে পানি প্রবেশের জন্য দায়ী করা হচ্ছে অপরিকল্পতিভাবে কালভার্ট নির্মাণ করাকে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুমতি ছাড়া এসব কালভার্ট নির্মাণ করার কারণে এ পরিস্থিতি সহজেই সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, এসব ডাইকে কালভার্ট নির্মাণ করতে অনুমতি নেয়া হয়নি। কুশিয়ারা ডাইকে কালভার্ট নয়, স্নুইস গেইট নির্মাণ করতে হয়। কারণ পানির প্রয়োজন হলে গেইট খুলে নেয়া যায় এবং পানি বাড়লে বন্ধ করে দেয়া যায়।

এদিকে, ওসমানীনগর উপজেলার পশ্চিম সাদীপুরের গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী কাতিয়া, ফেছিসহ নবীগঞ্জ ও জগন্নাথপুরের সাথে যোগাযোগের সব ক’টি সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রায় শতাধিক গ্রামের মানুষের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বন্যার পানিতে বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। আশংকা করা হচ্ছে, যে হারে পানি ঢুকছে তাতে আজ মঙ্গলবারের মধ্যে আরো নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হবে।

ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, “বাঁধের ভাঙা স্থান মেরামত এবং বন্যা কবলিতদের প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতা প্রদানে প্রশাসনিক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।”

অন্যদিকে, পার্শ্ববর্তী বালাগঞ্জ উপজেলার ৩টি ইউনিয়নে কুশিয়ারা ডাইকের অন্তত ২৬টি স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বালাগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ৫টি স্থান ভেঙে পানি প্রবেশ করায় বালাগঞ্জ বাজার, উপজেলা কার্যালয় ও একটি বালিকা বিদ্যালয় বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন ১০ সহস্রাধিক লোক। পূর্ব পৈলনপুর ইউনিয়নের কুশিয়ারা ডাইকের ২০টি স্থান ভেঙে যাওয়ায় ঐ ইউনিয়নের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। এছাড়া পূর্ব গৌরি ইউনিয়নের একটি স্থানও ভেঙে গেছে। পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন ঐ ইউনিয়নের কুশিয়ারা তীরবর্তী অন্তত ৬টি গ্রামের ৪ সহস্রাধিক মানুষ।

পূর্ব পৈলনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল মতিন বলেন, “কুশিয়ারা ডাইকের ২০-২৫ স্থান ভেঙে পানি প্রবাহিত হওয়ায় পুরো ইউনিয়ন বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে।”

বালাগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল মুমিন বলেন, “বাঁধের ৫ স্থানে ভাঙন দেখা দিলে বালাগঞ্জ বাজার, উপজেলা কার্যালয়, তৈরুন নেছা বালিকা বিদ্যালয়সহ অনেকের বসত ভিঠা ও রাস্তাঘাট তলিয়ে গেছে। এলাকার দশ হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন।”

পূর্ব গৌরীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিমাংশু রঞ্জন দাস বলেন, “আমার ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী অন্তত ৬ গ্রামের কয়েক শতাধিক পরিবারের লোক পানিবন্দী রয়েছেন।”

বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল হক বলেন, “বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙা স্থানগুলো সংস্কারের চেষ্টা এবং বন্যা কবলিতদের জন্য সরকারি ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত আছে।”

এদিকে, কুশিয়ারা ডাইক ভাঙার জন্য বাঁধের ওপর অপরিকল্পিতভাবে কালভার্ট নির্মাণকে দায়ী করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম বলেন, “বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর কালভার্ট বা ব্রিজ নির্মাণের কোন নিয়ম নেই। কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বিভিন্ন স্থানে কালভার্ট নির্মাণ করায় নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রম করার সাথে সাথে এসব কালভার্ড ভেঙে গিয়ে বাঁধের ভাঙন ত্বরান্বিত করছে।”

সাদীপুর এলাকায় বাঁধের ভাঙা স্থান মেরামত করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে বালাগঞ্জে এ পর্যন্ত কয়টি জায়গায় বাঁধ ভেঙেছে তা এখনো অবগত নন বলে জানান তিনি।