প্রয়াত পৌর মেয়র সিরাজুল জব্বারের শেষ সাক্ষাৎকার

২০১৫ সালে গোলাপগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন সিরাজুল জব্বার চৌধুরী। বহু প্রতীক্ষিত এ নির্বাচনে তাঁকে ঘিরে ভোটারদের আশা আকাঙ্খাও ছিলো অনেক। নির্বাচনের পর থেকে বেশ কয়েকটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিরাজুল জব্বার চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (৩১ মে) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই জনপ্রতিনিধি।

সদ্য প্রয়াত গোলাপগঞ্জ পৌরসভার মেয়র সিরাজুল জব্বার চৌধুরী জীবিত থাকাকালীন সর্বশেষ দেয়া সাক্ষাৎকারে গোলাপগঞ্জ পৌর এলাকার নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছিলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সিলেটভয়েস ডটকমের গোলাপগঞ্জ প্রতিনিধি হারিছ আলী

তিন বছরের দায়িত্ব পালনকালে নাগরিক সেবার মান কতোটা বাড়াতে পেরেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সিরাজুল জব্বার চৌধুরী বলেন, আমি যখন দায়িত্ব নিই, অনেক সমস্যা ছিল পৌর এলাকায়। আমি নির্বাচিত হওয়ার পর অনেক সমস্যা সমাধান করেছি। উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ ভাগ আর নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে শতভাগ সফল হয়েছি। আমি মেয়র নির্বাচনে জয়লাভ করার পর পৌর এলাকার ড্রেন, কালভার্টসহ অনেক উন্নয়নমূলক কাজকর্ম হয়েছে। পৌরসভার আয় থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করছি। নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে জন্ম, মৃত্যু সনদ ও পৌর কর আদায় করা সহ নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে আমি শতভাগ সফল।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন কিনা এর জবাবে মেয়র সিরাজুল জব্বার চৌধুরী জানান, ‘নির্বাচনের পর আমি আমার দেয়া পৌরবাসীকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যে অনেকটা বাস্তবায়ন করেছি। ড্রেন, কালভার্ট, রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করা হচ্ছে সাধ্যমতো। এসব উন্নয়নমূলক কাজে আমি নিজেই তদারকি করি। মানুষের সুবিধার্থে আমি পৌরসভার পাশে গণশৌচাগার নির্মাণ করেছি। গোলাপগঞ্জ চৌমোহনাতে আরো একটি গণশৌচাগার নির্মাণের ইচ্ছে থাকলেও ভূমি না থাকার ফলে নির্মাণ করতে পারছি না।’

পৌর এলাকায় ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত সিএনজি (অটোরিক্সা) ও ফুটপাত উচ্ছেদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি পৌর এলাকা থেকে অবৈধ সিএনজি ও ফুটপাত উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্ত প্রশাসনের অসহযোগীতার কারণে সফল হতে পারিনি।’

পৌর এলাকায় অকেজো থাকা সোডিয়াম বাতির ব্যাপারে মেয়র বলেন, ‘এসব বাতিগুলো নষ্ট হওয়ার সাথে সাথে আমি মেরামতের ব্যবস্থা করি। যাতে পৌরবাসী কোন কষ্ট না করেন। আমি মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর পৌর এলাকায় বাসা-বাড়ী নির্মাণের অনুমতি দিচ্ছি। ফলে এলাকায় অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এলাকায় নতুন নতুন বাসা-বাড়ী হচ্ছে।’

পৌরবাসীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে আর কি করার পরিকল্পনা আছে এমন প্রশ্নের জবাবে মেয়র সিরাজুল জব্বার চৌধুরী বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে পৌর এলাকার সব সমস্যা সমাধান করা হবে। ভাড়ার তালিকা টানানো হবে। পৌর এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সমস্যা সমাধানের লক্ষে ডিপ-টিউবওয়েল স্থাপন করা হচ্ছে। এছাড়া নাগরিকদের প্রতিটি সমস্যা সমাধানে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গোলাপগঞ্জ পৌরসভার মেয়র সিরাজুল জব্বারের পরিচিতি :

প্রয়াত পৌর মেয়র সিরাজুল জব্বার চৌধুরী ১৯৪৯ সালে ১ সেপ্টেম্বর রনকেলী উত্তর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। মরহুম আব্দুল জব্বার চৌধুরী ও মরহুম নজিবা খাতুন চৌধুরীর একমাত্র সন্তান সিরাজুল জব্বার চৌধুরীর পড়াশোনা গোলাপগঞ্জের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ এম সি একাডেমি মডেল স্কুল এন্ড কলেজে। পড়াশুনা শেষে তিনি ব্যবসায় মনোযোগ দেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রথম শ্রেনীর ঠিকাদার হিসেবে সুখ্যাতি রয়েছে।

ঠিকাদারী ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন সিরাজুল জব্বার চৌধুরী। তরুণ বয়সে তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হাতে নেন। গোলাপগঞ্জের প্রাচীন বিদ্যাপীঠ এম সি একাডেমির গভর্নিং বডির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন প্রায় ৩০ বছর। রনকেলী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সহ সভাপতি পদে দীর্ঘ্য ৩৫ বছর যাবত দায়িত্ব পালন করেছেন। রনকেলী মহিসুন্নাহ মাদ্রাসার সভাপতি, গোলাপকুঁড়ি শিশুবিদ্যালয়ের সভাপতি সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি গোলাপগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও গোলাপগঞ্জ পৌরসভার প্রতিষ্ঠাকালীন পৌর প্রশাসক ছিলেন। এছাড়াও সিরাজুল জব্বার চৌধুরী ছিলেন বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী, ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক।

বৃহস্পতিবার (৩১ মে) বিকেলে ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গোলাপগঞ্জ উপজেলার এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় জনপ্রতিনিধি।