প্রাণহীন সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমী

২২ বছরেও নেই নির্বাচন, অ্যাডহক কমিটি দিয়েই চলছে

নির্বাচিত কমিটির মেয়াদই যেখানে ৩ বছর সেখানে অ্যাডহক কমিটি দিয়েই ৮ বছর পার করেছে সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমী। অথচ এ অ্যাডহক কমিটিরই কোনো অনুমোদন নেই। ২২ বছর ধরে এভাবেই জোড়াতালি দিয়েই চলছে সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের অভিভাবক সংগঠন। জোড়াতালির এ সংসারে কারো যেনো কোনো দায় নেই।

শিল্পকলা একাডেমীর মূল প্রাণ যারা সেই সংস্কৃতিকর্মীদের কোনো মূল্যায়ন নেই সিলেটে। এমনকি একাডেমীতে সাধারণ সদস্য তালিকাভুক্তিরও গরজ নেই। বড় বড় উপলক্ষ্যেও দায়সারা কর্মসূচি দিয়েই কাজ চালিয়ে নেয় শিল্পকলা একাডেমী। সংস্কৃতিকর্মীদের সম্পৃক্ততা না থাকায় বলতে গেলে প্রাণহীন হয়ে আছে জেলা শিল্পকলা একাডেমী।

সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্যই শিল্পকলা একাডেমীর প্রতিষ্ঠা। কিন্তু সিলেটে সাংস্কৃতিক বিকাশের ক্ষেত্রে একাডেমী একেবারেই ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। সবধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বলতে গেলে থমকে আছে সিলেট শিল্পকলা একাডেমিতে। একাডেমীর কার্যক্রম চলছে সরকারী কিছু ছকঁবাধা নিয়মে।

দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত কমিটি না থাকায় কালচারাল অফিসারই সর্বেসর্বা হয়ে উঠেন সিলেটের শিল্পকলা একাডেমীতে। এ কারণে কেউ কেউ বেপরোয়াও হয়ে উঠেন। অনৈতিক আচরণের অভিযোগে সংস্কৃতিকর্মীরা আন্দোলনে নামলে ২০১৬ সালে সিলেট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় কালচারাল অফিসার অসিত বরণ দাস গুপ্তকে। হবিগঞ্জ ঘুরে গত ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি আবার ফিরে এসেছেন সিলেটে। যেনো সময় দেওয়া হয়েছিলো সংস্কৃতিকর্মীদের ‘শান্ত হওয়া’র। অনেকেই মনে করছেন এ কারণে মধ্যবর্তী সময়ে সিলেটে কোনো কালাচারাল অফিসারকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। কালচারাল অফিসারহীন সময়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে একাডেমী সামাল দিয়েছিলেন সিলেট সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাজী আরিফুর রহমান।

নির্বাচনের মাধ্যমে সিলেটে শিল্পকলা একাডেমীর সর্বশেষ কমিটি গঠিত হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। ১৯৯৬ সালে পর্যন্ত এ কমিটি দায়িত্ব পালন করে। এরপর সারা দেশে একসাথে শিল্পকলা একাডেমীর নির্বাচন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পর্যায়ক্রমে সারা দেশের শিল্পকলা একাডেমীগুলো নির্বাচনী ধারায় ফিরে এলেও সিলেটে নির্বাচনের বন্ধ দুয়ার আর খুলেনি।

প্রায় ২২ বছর থেকে নির্বাচন নেই। ৮ বছর ধরে অ্যাডহক কমিটি দিয়ে চলছে কার্যক্রম। স্বাভাবিকভাবেই তাই স্থবিরতা নেমে এসেছে সিলেটের সংস্কৃতি অঙ্গনে। শিল্পকলা একাডেমীর কার্যক্রমে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণ না থাকায় জাতীয় পর্যায়ের কোনো শিল্পী গড়তে ব্যর্থ হচ্ছে সিলেট। তবে নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখতে একাডেমী সংশ্লিষ্টরা নিজেদের পছন্দের কিছু সংস্কৃতিকর্মীকে ‘এক্সট্রা খাতির’ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সিলেটে শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৯ সালে কার্যকরী কমিটির প্রথম নির্বাচন হয়। এরপর ১৯৯৩ সালে সর্বশেষ নির্বাচনে যে কমিটি গঠিত হয় তা ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত চলে। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। তারপর ২২ বছর ধরে অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমেই কার্যক্রম চলছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে ফের ৩ সদস্যের অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। মদনমোহন কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সিলেট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক গৌতম চক্রবর্তী এবং জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের সে সময়কার ভাইস চেয়ারম্যান মুক্তাদির আহমদ মুক্তাকে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়। জানা গেছে, ৮ বছরেও এ অ্যাডহক কমিটি শিল্পকলা একাডেমীর অনুমোদন পায়নি।

স্বভাবতই ‘অনুমোদনহীন’ অ্যাডহক কমিটির ‘কদর’ নেই জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধুমাত্র বাজেট ও অনুষ্ঠান শেষের মুল্যায়ন সভাতে ডাক পান অ্যাডহক কমিটির সদস্যরা। তবে শিল্পকলা একাডেমীর কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় উনাদের ডেকেও পাওয়া যায় না। অপরদিকে, অ্যাডহক কমিটির সদস্যদের অভিযোগ, কিছু সরকারি অনুষ্ঠান ছাড়া শিল্পকলায় বর্তমানে আর কোনো অনুষ্ঠান হয় না। এক্ষেত্রে এডহক কমিটির কোনো অবদান থাকে না।

অ্যাডহক কমিটির অন্যতম সদস্য মদন মোহন কলেজের অধ্যক্ষ আবুল ফতেহ ফাত্তাহ কার্যনির্বাহী কমিটি গঠন ও নির্বাচন সম্পর্কে বলেন, সঠিক উদ্যমের অভাবে আমরা এটা করতে পারছি না। দীর্ঘ সময় থেকে অ্যাডহক কমিটির কার্যক্রমেও গতি নেই। নতুন জেলা প্রশাসকের সাথে আলাপ করে একটা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
অ্যাডহক কমিটির সদস্য ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক গৌতম চক্রবর্তী জানান, দীর্ঘদিন অ্যাডহক কমিটি থাকা উচিত নয়। আমরা আলাপ আলোচনা করে একটি সম্মেলনের মাধ্যমে পুর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করবো।

পদাধিকার বলে অ্যাডহক কমিটির সদস্য সচিব ও জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা অসিত বরণ দাসগুপ্ত জানান, অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয় ২০০৯ সালে। আর আমি চাকুরিতে যোগদান করি ২০১৩ সালে। চাকরিতে যোগদান করে অ্যাডহক কমিটি পেয়েছি যা এখনও চলছে।

শিল্পকলা একাডেমির নিষ্ক্রিয়তায় সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করছে। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য শামসুল আলম সেলিম জানান, জেলা শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচিত কার্যকরী কমিটি না থাকার কারণে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। পর্যাপ্ত অনুষ্ঠান থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে সিলেটবাসী।

শিল্পকলা একাডেমির নির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক আল আজাদ বলেন, নির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটি অবশ্যই প্রয়োজন। কর্মকর্তারা এটা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে পালন করে থাকেন। এক্ষেত্রে নির্বাচিত কার্যনির্বাহী পরিষদ থাকলে সাংস্কৃতিক কর্মীরা সম্পৃক্ত হয়ে নিজ উদ্যোগে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড আরও বেগবান হয়।

সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর আহমদ চৌধুরী বলেন, আমাদের কমিটিটাই সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি। যার নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯৩ সালে। আমরা ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করি। এরপর আর কোন নির্বাচন হয়নি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে হলে নির্বাচন ও নির্বাচিত কমিটির বিকল্প নেই।