পুলিশের গুলিতে তরুণের মৃত্যুকে ঘিরে বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স

0
0

ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে পুলিশের গুলিতে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণের মৃত্যুর জেরে ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে ফ্রান্স। ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে।

বৃহস্পতিবার বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিনে অস্থিরতা, পুলিশের ওপর হামলা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে অন্তত ১৮০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে এ পর্যন্ত আহত হয়েছেন আরও ১৭০ জন। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের জন্য ইতোমধ্যে ফ্রান্সজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে ৪০ হাজারেরও বেশি পুলিশ।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিক্ষোভের প্রথম দিন এ ঘটনায় পুলিশের নিন্দা জানালেও বিক্ষোভ ক্রমশ তীব্র রূপ ‍নিতে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শুক্রবার মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন তিনি।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে মঙ্গলবার। ওইদিন সকালে প্যারিসের উপশহর নানতেরে ট্রাফিক বিধি অমান্য করে জোরে গাড়ি চালানোর অভিযোগে নাহেল এম. নামের ১৭ বছর বয়সী এক তরুণ গাড়ি থামানোর নির্দেশ দিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু নাহেল তাতে কর্ণপাত না করে গাড়ি নিয়ে সরে পড়ার চেষ্টা করলে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন পুলিশ সদস্যরা। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় নাহেলের।

নাহেলের পরিবারের সদস্যরা আলজেরিয়া থেকে এসে ফ্রান্সে স্থায়ী হন। তাদের আর্থিক অবস্থাও খুব ভালো নয়। প্যারিসের নানতের উপশহরটি মূলত দরিদ্র অধ্যুষিত এলাকা। সেখানেই মায়ের সঙ্গে থাকতেন তিনি। নাহেল ও তার মা মৌনিয়া ইসলাম ধর্মাবলম্বী।

পুলিশের গুলিতে নাহেল নিহত হওয়ার পরই বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে নানতেরে। তারপর বৃহস্পতিবার বিকেলে এক অনলাইন বার্তায় নাহেলের মা মৌনিয়া তার নিহত ছেলের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি জানান। সেই সঙ্গে পাশে থাকার জন্য বিক্ষোভকারীদের ধন্যবাদও জানান তিনি।

তার এই অনলাইন বার্তা পোস্ট হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে আন্দোলন তীব্র রূপ নিতে থাকে। প্যারিসসহ ফ্রান্সের শহর শহরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে বিক্ষোভ।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গেরাল্ড ডারমানিন শুক্রবার এক টুইটবার্তায় বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতজুড়ে অসহনীয় সংহিংসতা হয়েছে ফ্রান্সে। রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে প্রজাতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে পরিচিত একাধিক ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে।’

ফ্রান্সের বামপন্থী দলগুলো পরোক্ষভাবে এই বিক্ষোভে উসকানি দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

জাস্টিস ফর নাহেল :

উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। ফলে রাজধানী প্যারিসসহ ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে এমন অনেক আলজেরীয় বসবাস করছেন- যারা গত ৩ কিংবা ৪ প্রজন্ম ধরে ফ্রান্সে বসবাস করছেন। ফ্রান্সের জাতীয় ফুটবল দলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানও একজন আলজেরীয় বংশোদ্ভূত ফ্রেঞ্চ।

তবে আলজেরীয় বংশোদ্ভূতদের অভিযোগ- ফ্রান্সের সরকার তাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে এবং ফ্রান্সের মূল সমাজ সংস্কৃতি কখনও তাদেরকে মূল ফরাসি নাগরিকদের সম্মান দেবে না।

বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের এই বিক্ষোভ প্রকাশিত হয়। নাহেলের মৃত্যুর পর আরও একবার তা প্রবলভাবে বেরিয়ে এসেছে।

মূল বিক্ষোভ হচ্ছে প্যারিসে। দুইজন বিক্ষোভকারী বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘তারা (ফরাসিরা) আমাদের সঙ্গে যে আচরণ করে, তা অত্যন্ত অপমানজনক। আমরা নাহেলের জন্য বিক্ষোভ করছি। আমরাই নাহেল।’

আরেক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আমরা গত তিন-চার প্রজন্ম ধরে ফ্রান্সে বসবাস করছি, কিন্তু তারা (ফরাসিরা) এখনও আমাদেরকে এ দেশের নাগরিক বলে ভাবতে পারে না।’

ম্যাক্রোঁর আশ্বাস :

যে পুলিশসদস্য নাহেলকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে ইচ্ছাকৃত ভাবে হত্যার অভিযোগে বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বৃহস্পতিবার এক বার্তায় বিক্ষোভকারীদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘পুলিশের গুলিতে কিশোর হত্যার ঘটনা ন্যাক্কারজনক এবং তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটা ক্ষমতার অযোগ্য অপরাধ। আমরা ইতোমধ্যে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করছি এবং সবাইকে শান্ত হওয়ার অনুরোধ করছি।’

কিন্তু এই ঘোষণায় তেমন কাজ হয়নি। বিক্ষোভ থামার কোনো লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না।

প্রেসিডেন্টের একজন উপদেষ্টা এএফপিকে বলেছেন, ‘আমার আশঙ্কা হচ্ছে- প্যারিসে আবারও ২০০৫ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে কিনা।’

২০০৫ সালে দুই কৃষ্ণাঙ্গ কিশোর পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে দাঙ্গা শুরু হয়েছিল ফ্রান্সে। সেই দাঙ্গায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন অন্তত ৬ হাজার মানুষ।