পলাতক খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার দাবি প্রবাসি ভাই-বোনের

আদালত চত্বরে খুন, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন

সুনামগঞ্জ আদালত চত্বরে জগন্নাথপুরের মিজানুর হোসেন খোকন হত্যার সাথে জড়িত পলাতক আসামিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচারের মাধ্যমে ফাঁসির দাবি জানানো হয়েছে।

শনিবার (৬ আগস্ট) বিকেলে সিলেট জেলা প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান মিজানুর রহমান খোকনের যুক্তরাজ্য প্রবাসি ভাই ও বোনেরা। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতে তারা প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপির হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এর আগে গত ২১ জুলাই সুনামগঞ্জ আদালত চত্বরে সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাতে খুন হন জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের গলাখাল গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান খোকন। ভাই হত্যার সংবাদ শুনে প্রবাসে মন টিকেনি খোকনের চার ভাই ও দুই বোনের। দেশে থাকা একমাত্র ভাইকে শেষবারের মত দেখতে তারা যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ছুটে আসেন।

সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নিহতের বড় ভাই যুক্তরাজ্য প্রবাসি ও জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের গলাখাল গ্রামের বাসিন্দা মো. মোশারফ হোসেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, গত ২১ জুলাই সুনামগঞ্জ আদালত চত্বরে আমার খোকন খুনের পর পরই আদালতে থাকা লোকজন হাতেনাতে তিন খুনিকে ধরে পুলিশে দেন। এঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত অপর দুইজন তখন ঘটনাস্থল থেকে কৌশলে পালিয়ে যায়। এদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে মামলার সকল আসামিকে ফাঁসি কার্যকর করতে হবে। তাহলে আদালতপাড়ার মতো নিরাপদ ও পবিত্র স্থানে ভবিষ্যতে এমন জঘন্য অপরাধ করার সাহস পাবে না।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, নিহতের লন্ডন প্রবাসী ভাই মো. দেলোয়ার হোসেন, মো. আনোয়ার হোসেন, শিপন মিয়া, বোন রুসনা বেগম, সালমা বেগম, বোন জামাই ওমর মিয়া, ভাগনি নাদিয়া বেগম, নিহতের শিশু সন্তান মাহফুজ হোসেন (১২), মাহমুদ হোসেন (৪), মেয়ে ফাইজা (১৩) ও আত্মীয় কয়ছর আহমদ সাজু।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, মিজানুর হোসেন খোকন বাবা ও তার তিন শিশু সন্তানকে নিয়ে সিলেট শহরে বসবাস করেন। জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের গলাখাল গ্রামের বাড়িঘর ও সহায় সম্পত্তি, পরিবারের লোকজনের চিকিৎসাসহ সব ধরণের কাজ পরিচালনা ও দেখাশোনা করতেন তিনি। কিন্তু সহায়-সম্পত্তি ও বাড়িঘর দখল করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরণের কৌশল ও প্রকাশ্যে প্রাণে হত্যার হুমকিসহ ভয়ভীতি এমনকি বারবার চাঁদা দাবি করে আসছিল একই গ্রামের মৃত মহিবুর রহমানের ছেলে সন্ত্রাসী ফয়েজ আহমেদ, আফরোশ মিয়ার ছেলে সেবুল মিয়া, সাজিদ মিয়া, বাদশা মিয়ার ছেলে শাহান মিয়া, মৃত লাল মিয়ার ছেলে ও চাঁদাবাজ ঈসরাইল ও ওমান প্রবাসী চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের মূলহোতা বাদশা।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, গত বছরের ২৪ অক্টোবর তাদের আত্মীয় কাপ্তান মিয়ার কাছ থেকে দেড় শতক জমি ক্রয় করেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। সে জমি ক্রয়ের পর তা দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেন ওমান প্রবাসী বাদশা, ঈসরাইল, ফয়েজ, শাহান, সাজিদ, সেবুলসহ তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী। যার ফলে চলতি বছরের ২১ এপ্রিল ক্রয়কৃত জায়গাটি দেখতে যান খোকন। তখন ফয়েজ, শাহান, সাজিদ, সেবুল, সাইদুল, হাসিনা বেগম, আফরুস, রহিমুন বেগম, রাফিন বেগম, রাবেয়া বেগম, সুহেনা বেগম, সাজেদা বেগম, রহিমা বেগম ও অজ্ঞাতনামা আরো ৫/৬ জন পূর্ব পরিকল্পিতভাবে খোকনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। সে সময় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করান। এ ঘটনায় খোকন বাদী হয়ে জগন্নাথপুর থানায় অভিযোগ দাখিল করেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তা জগন্নাথপুর থানার এসআই সাত্তার ফয়েজ হামলাকারীদের থানায় ডাকেন, কিন্তু ফয়েজ ও তার বাহিনী থানায় হাজির না হয়ে উল্টো এ ঘটনাকে আড়াল করতে মিথ্যে কল্প-কাহিনী সাজিয়ে থানায় অভিযোগ দাখিল করে। ফলে থানা কর্তৃপক্ষ কারো মামলা না নিয়ে আদালতে স্মরণাপন্ন হতে পরামর্শ প্রদান করেন। পরে খোকন বাদি হয়ে সুনামগঞ্জ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জগন্নাথপুর থানার (সিআর মামলা নং-৭২/২২ইং) দাখিল করেন।

মামলা দাখিলের পর ওমান থেকে ফোন করে বাদশা বিভিন্ন জনকে বলে খোকনকে যে কোনভাবে খুন করিয়ে মামলা করার স্বাদ মিটিয়ে দিবে। এরই ধারাবাহিকতায় ফয়েজ, ঈসরাইল, শাহান, সাজিদ, সেবুলরা এলাকায় প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া দিয়ে বলতে থাকে খোকন ও তার পরিবারের কাউকে এলাকায় ঢুকতে দিবে না, সকল সম্পত্তি জোরে দখল করে নিবে এবং খোকনকে যেখানেই পাবে জীবনের মতো শেষ করে দিবে। তখন বাড়িতে থাকা প্রবাসিদের চাচতো ভাই মাসুক ও তার ছেলেদের দেখলেই ফয়েজরা অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও প্রাণে হত্যার হুমকি দেয়।

এ ঘটনায় মাসুক মিয়া বাদী হয়ে জগন্নাথপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন, যা তদন্ত শেষে সত্য প্রমাণিত হলে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। যা জগন্নাথপুর থানার নন জি, আর ১৬৬/২২ইং হিসেবে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। মামলাগুলো হওয়ার পর থেকে ওমান প্রবাসী বাদশার হুকুমে ফয়েজ, ঈসরাইল, শাহান, সাজিদ, সেবুলরা খোকনকে হত্যার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকে।

গত ২১ জুলাই সুনামগঞ্জ আদালতে নন জিআর-১৬৬/২২ মামলার ধার্য তারিখ ছিল। ওই তারিখে আদালতে হাজিরা দিতে যায় ফয়েজ, ঈসরাইল, শাহান, সাজিদ, সেবুল। এদিন মাসুকের সাথে তার দাখিলকৃত মামলার খবর নিতে আদালতে যান খোকন।

মাসুকের মামলার আসামি সন্ত্রাসী ফয়েজ, ঈসরাইল, শাহান, সাজিদ ও সেবুল হাজিরা দেয়া শেষে পরিকল্পনা মাফিক খোকনকে সুনামগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সহকারী সমিতির আঙ্গিনায় জনসম্মুখে ছুরি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে বুকে, ঘাড়ে, দুই হাতে বেশ কয়েকটি আঘাত করে নির্মমভাবে খুন করে পালিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত লোকজন খুনি ফয়েজ, সেবুল ও সাজিদকে আটক করে এবং বাকি দুই খুনি ঈসরাইল ও শাহানকে জনতা ও আদালত চত্বরে থাকা পুলিশ আটক করলেও কৌশলে পালিয়ে যায় দুই খুনি।

খুনের ঘটনায় আটক ফয়েজ আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি প্রদান করেছে। কিন্তু ঘটনার ১৫ দিন পরও মামলার এজাহার নামীয় ও খুনে সরাসরি অংশগ্রহণকারী ঈসরাইল, শাহান ও অজ্ঞাতনামাদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

তাই খুনের ঘটনার পরিকল্পনাকারি, হুকুমদাতা ওমান প্রবাসী বাদশা, খুনের ঘটনায় সরাসরি অংশগ্রহণকারী ঈসরাইল, শাহানসহ অন্যান্যদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে মামলাটির সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে, দ্রুত বিচারের মাধ্যমে খুনের ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত ও সহায় সম্পত্তি রক্ষা, প্রবাসি ভাই-বোন এবং পরিবারের লোকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জোর দাবি জানান প্রবাসিরা।