নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়না ও একজন বীরের প্রস্থান

একজন নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়না। দেশের বীর সৈনিক এক মুক্তিযোদ্ধার প্রয়াণ। রোববার (১৭ ডিসেম্বর) তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। তাঁর প্রতি আমাদের ঋণ অফুরান।

নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়না যেমন গর্ব করে বলতেন- ‘আমি দেশের জন্য একদা জীবন দিতে গিয়েছিলাম।’ ঠিক তেমনই স্বপ্ন দেখতেন এ দেশ একদিন বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে থাকবে।

এক সাক্ষাতকারের তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী আমাদের সম্পদ লুন্ঠন করত। সেসময় আমাদের দেশের মানুষের অনেকের পায়েই স্যান্ডেল পরার সামর্থ ছিলো না। ধনও ধানে ভরপুর থাকলেও আদেরকে অসহায়ের মত থাকতে হতো। কিন্তু আজ আমাদের সব হয়েছে, দেশ হয়েছে, উন্নয়ন হয়েছে। তার একমাত্র কারণ বাঙালীর মনে শক্তি ছিলো, সাহস ছিলো, দেশের প্রতি ভালোবাসা ছিলো। আমার বিশ্বাস দেশপ্রেমের এ ধারাবাহিকতা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ধরে রাখবে।’

নিজের পায়ে হাত দিয়ে দেখিয়ে বলেন, ‘আমার পায়ে গুলি লেগেছিলো। আমাকে খাটিয়া করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিলো ক্যাম্পে। তখন আমার মায়ের কথা মনে হচ্ছিলো। পা দিয়ে রক্ত পড়ছিলো। মনে হচ্ছিলো আর বাঁচব না। তাই একবার যদি মায়ের মুখটা দেখে যেতে পারত। তখন নিস্তেজ হয়ে আসছিলো আমার শরীর, চোখ মেলতে পারছিলাম না। কষ্ট করে যখন চোখ মেলে তাকালাম তখন আকাশটা দেখলাম, আমার দেশ দেখলাম। মনে হলো এই বুঝি আমার মা, এই আমার পরিবার। শান্ত হলো মন। প্রচন্ড যন্ত্রণার মাঝেও আমি শান্তি অনুভব করলাম।’

দেশের জন্য লড়াই করে বিজয়ী নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়না আজ জীবন যুদ্ধে পরাজিত হলেন। চলে গেলেন না ফেরার দেশে। কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেছেন অজস্র স্মৃতি।

গত কয়েকদিন থেকে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে রোববার (১৭ জানুয়ারি) রাত ৯টা ২০ মিনিটে রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন সিলেটের প্রবীণ নাট্য সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়না। (ইন্না লিল্লাহি…রাজিউন)

স্মৃতির পাতায় বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়না :

১৯৫২ ইংরেজি সালের ৯ এপ্রিল সিলেট নগরীর লামাবাজার এলাকার বিলপাড়ে নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়নার জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম- ফকর উদ্দিন লস্কর, মাতার নাম- সাহার বানু লস্কর। ৫ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে নিজাম উদ্দিন লস্কর সবার বড়।

তিনি দুর্গাকুমার পাঠশালা থেকে প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে মাধ্যমিকে পড়ালেখা করেন সিলেট সরকারি পাইলট হাইস্কুলে। আর ১৯৬৯ ইংরেজি সালে সিলেট সরকারী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। পরে ১৯৭২ ইংরেজি সালে এমসি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন।

জীবনের ৫ বছর কাটে তাঁর পশ্চিম জার্মানে। ১৯৬২ ইংরেজি সালে প্রসাদ বিশ্বাস রচিত ‘পরাজয়’ নাটক নিয়ে নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়নার মঞ্চ অভিনয় শুরু হয়। এর পর একে একে টিভি নাটক, রেডিও নাটক, চলচ্চিত্র এ তিন মাধ্যমেই অভিনয় করেছেন তিনি।

রেডিও, টিভি নাটক ও মঞ্চনাটক মিলে প্রায় শতাধিক নাটকের নাট্যকার নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়না এক টানা ১০ বছর সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমির নাটকের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্দেশনাও দিয়েছেন শ’খানেক মঞ্চনাটকে। তাঁর রচনা করা নাটকগুলোর মধ্যে ‘রক্তপলাশ, গ্রাস, পাগলাগারদ, ঝুঁকি, যুগবদলের হাওয়া’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তিনি বেশ কয়েকটি বইয়ের রচনাও করেছেন। এযাবৎ বেশ কয়েকটি ইংরেজি সাহিত্যের অনুবাদও করেছেন তিনি।

সর্বজন শ্রদ্ধেয় নিজাম উদ্দিন লস্কর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ‘বন্ধন, পাপি শত্রু, খুনের বদলা’।

তিনি সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেট’র ৩ বার প্রধান পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সিলেট ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকে টানা ৩ বার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়না ছিলেন ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনের একজন সম্মুখসারির যোদ্ধা।

আরও পড়ুন : না ফেরার দেশে মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়না

বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়না বর্তমানে বসবাস করছিলেন লামাবার এলাকার বিলপাড়ে তাঁর পৈতৃক নিবাসে। ১ ছেলে ও এক মেয়ের জনক নিজাম উদ্দিন লস্করে সহধর্মিণী নাজিয়া সুলতানা। ১৯৭৪ সালের ২৮ জুলাই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

নিজাম উদ্দিন লস্কর ১৯৯৭ ইংরেজি সাল থেকে এখন পর্যন্ত শ্যামলিমা লিমিটেড নামক একটি তেল গ্যাস অনুসন্ধানী কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন।

তিনি সিলেটের নাট্যকর্মীদের একজন অভিভাবক হিসেবে সর্বদাই সম্মিলিত নাট্য পরিষদকে দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। করোনাকালীন সময়েও তাঁর অনুবাদ ও নির্দেশনায় উলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ নাটকের অংশবিশেষ পরিবেশন করে সম্মিলিত নাট্য পরিষদ।

বর্তমানে তিনি সিলেট ফটোগ্রাফিক সোসাইটির উপদেষ্টা হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভোগলেও স্ত্রী-স্বজন নিয়ে সুখেই কাটছিল তাঁর সময়।

দেশের তরুণ প্রজন্ম উন্নত দেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলবে, দেশের উন্নয়নে চিন্তাশীল হবে এবং দেশকে ভালবাসবে, মানুষ দেশের কল্যাণে কাজ করবে এমনটাই প্রত্যাশা ছিল নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়নার। হয়তো অচিরেই কোন একদিন পূরণ হবে তাঁর সেই প্রত্যাশা।

(মৃত্যুর কয়েকদিন আগেই বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজাম উদ্দিন লস্কর ময়নার কাছ থেকেই তাঁর জীবনতথ্য সংগ্রহ করেছিলেন সিলেট ভয়েসের নিজস্ব প্রতিবেদক শাহ শরীফ উদ্দিন)