নতুন প্রজন্ম রাজনীতিকে ঘৃণা করে!

‘আই হেইট পলিটিকস’ বা ‘আমি রাজনীতি ঘৃণা করি’- এটা হচ্ছে এই প্রজন্মের সব থেকে প্রচলিত বানী। শিক্ষিত সমাজের বৃহত্তম একটা অংশও এটাই মনে ধারণ করে, যার সত্যতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরলেই পাওয়া যায়। ফেসবুকের প্রোফাইল ঘুরলেই দেখা যায় পলিটিকাল ভিউতে একটা কথাই লেখা- ‘আই হেইট পলিটিক্স’! পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে এর মাত্রা ৯০ ভাগ, কিন্তু প্রাইভেট র্ভাসিটির ৯৯ ভাগই ছাত্ররাজনীতিকে ঘৃণা করছে, যা ভবিষ্যতে যোগ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের জন্য হুমকি। দূর্বৃত্তদের কাছে রাজনীতি শতভাগ হারিয়ে গেলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার তা যে কেউ বোঝে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- কেন শিক্ষিত তরুণরা রাজনীতি থেকে দুরে থাকছে?

আমাদের দেশের প্রতিটি গৌরবের ইতিহাসে নেতৃত্ব দিয়েছে ছাত্ররা। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন সহ একাত্তরে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে এ দেশের ছাত্ররা এবং তা ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক প্লাটর্ফম থেকে। ছাত্ররাজনীতির কল্যানে আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিব, জননেতা ভাসানী, ফজলুল হক সহ ইতিহাসের সব কিংবদন্তী নেতাদেরকে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যাদেরকে থিংক ট্যাংক হিসেবে গন্য করা হয়, তাদের বৃহৎ অংশ উঠে এসেছেন তৃণমূলের ছাত্ররাজনীতি থেকে। ৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমদ, আমির হোসেন আমু, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরদের সৃষ্টি করেছে আমাদের দেশের সৃষ্ট ছাত্র রাজনীতি।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ছাত্রজীবনে তুখোর ছাত্রনেত্রী ছিলেন। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা তিনি ছাত্ররাজনীতি থেকেই শিখেছেন, যা তাঁকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। একটা দেশের ছাত্ররাজনীতির এতো এতো গৌরবের ইতিহাস-ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও কেন শিক্ষিত সমাজ ছাত্র রাজনীতি থেকে বিমুখ হচ্ছে? বখাটেদের মাঝে কেন হারিয়ে যাচ্ছে ছাত্ররাজনীতি? একটা সময় একজন ছাত্রনেতা বললে চোখের সামনে ভেসে আসতো ব্যক্তিত্ববান একজন শিক্ষিত তরুণের প্রতিচ্ছবি। আর বর্তমানে কেউ ছাত্রনেতা পরিচয় দিলে সাধারণ জনগণ ভাবে বখাটে, ইয়াবা বা ফেন্সিডিল সেবনকারী একজন অনৈতিক ক্লাসের লাষ্ট বেঞ্চের ছাত্র।

এই পরিবর্তন একদিনে হয়নি। এর অনেক অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ দেশের সিংহভাগ মানুষ বিশ্বাস করে। বর্তমানে ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্রদের কোন দাবি-দাওয়া বা দেশের ভাল-মন্দ না ভেবে রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে লেজুরবৃত্তি করে যাচ্ছে ছাত্ররাজনীতির নেতৃত্বরা। এর কারণেই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সোহাগ মিডিয়াকে বলতে পেরেছিলেন- ‘এই সরকারের আমলে কোন প্রশ্ন ফাঁস হয়নি’। মিডিয়ার কল্যানে সারা দুনিয়া জানে বাংলাদেশে প্রশ্নপত্র ফাঁস ক্যান্সারের মত কি করে সব পাবলিক পরীক্ষায় ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ দেশের বৃহৎ একটি ছাত্র সংগঠনের সভাপতি হয়ে তিনি জানেন না বা নির্লজ্জের মতো মিথ্যা বলে গেছেন মূল দলের লেজুরবৃত্তির কারণে। অথচ একজন ছাত্রনেতা হিসেবে তার উচিত ছিল ছাত্রদের নিয়ে প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাওয়ার। সততা ও আদর্শের জায়গায় সোহাগ থাকতে পারেননি, তার প্রমাণ মিডিয়াতে আসা তার ৬ কোটি টাকার বাড়ি।

আমরা দেখেছি বিএনপির আমলে ডজন ডজন মামলার আসামি নাসির উদ্দিন পিন্টু। বিভিন্ন ধরনের ভয়ংকর সব অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত সেই নাসির উদ্দিন পিন্টুকে করা হয় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি। ‘গুম’ হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ছাত্রদলের নেতৃত্বে ছিলেন, অথচ লোকমুখে তার নাম ছিল ‘পিস্তল আলী’। এই যদি হয় ছাত্র নেতাদের মানদণ্ড, তা হলে কী করে শিক্ষিত ও যোগ্যরা রাজনীতিতে নাম লেখাবে?

বর্তমান ছাত্ররাজনীতির সিংহভাগ নেতা টেন্ডারবাজি, জমি দখল ভাগবাটোয়ারায় ব্যস্ত। যা প্রতিনিয়ত মিডিয়ায় আসছে এবং এর কারণেই শিক্ষিত এবং সচেতন মহল রাজনীতিকে ঘৃণা করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতার ইয়াবা সেবনের ছবি দেশবাসী দেখেছে মিডিয়ার কল্যাণে। ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি সহ সব ধরনের অপরাধের খবর ছাপা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, বড় দলগুলোর মাঝে ছাত্ররাজনীতি বলতে কিছু নেই, আছে দল ভারী করার প্রতিযোগীতা।

এক সময় নেতা নির্বাচিত হতেন নেতৃত্বের গুণাবলী এবং ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ছাত্র, কিন্তু বর্তমানে গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি কে কতটা অনুগত এবং তার দল কত বড়! এই দল ভারী করতে গিয়ে নেতারা যে আসছে, তাকেই দুই হাতে বুকে টেনে নিচ্ছেন। বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পরা ছেলেকে দলে নিচ্ছেন কোন বাছবিচার ছাড়াই। লাভ একটাই- নিজ গ্রুপে মানুষ বাড়বে।

৭১ এর চেতনাকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে বুকে লালন করে স্বাধীন বাংলাদেশে যে ছাত্রলীগের পথ চলা, সে দলে আজ দল ভারী করার প্রতিযোগীতায় স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিদেরও দেখা যাচ্ছে। বিএনপির ‘ভ্যানগার্ড’ হিসেবে পরিচিত ছাত্রদল কোন আদর্শে রাজনীতি করছে তা তাদের সিংহভাগ জানে না। ছাত্রদলের সব কমিটিতেই স্থান পাচ্ছেন বিবাহিত আর ব্যবসায়ীরা। তাই বিগত কয়েক বছরে ছাত্রদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন আন্দোলনে দেখা যায় নি ছাত্রদলকে। অথচ আন্দোলন করার জন্য প্রশ্ন ফাসেঁর মত একটা বড় ইস্যু ছিল তাদের।

তবে সমালোচনার আর মন্দের ভেতরে অনেক মেধাবী ছাত্রনেতাও আছেন, যারা আদর্শের রাজনীতি করছেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা এতো কম যে তারা মাঠে টিকতে পারছেন না। সিংহভাগ ছাত্ররাজনীতির কর্মীরা জানেই না নিজ নিজ দলের আদর্শের ভিত্তি কি। তারা কি আদর্শে রাজনীতি করছে। কারণ একটাই, আদর্শ নিয়ে ভাবার সময় কই? ভাবনায় শুধু টেন্ডার, ব্যবসা, নিজ স্বার্থ, নিজের পেশী শক্তির জানান দেওয়া!

কথা আসতে পারে, বাংলাদেশে কি শুধু ছাত্ররাজনীতিতেই দূর্বৃত্তায়ন? উত্তর অবশ্যই না। তবে ছাত্ররাজনীতির দূর্বৃত্তায়ন অন্য সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।

আদর্শের বা মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু এ কেমন আদর্শ! এ কেমন রাজনীতি, যেখানে নিজ দলের কর্মীকে খুন হতে হচ্ছে একই আদর্শের আরেক কর্মীর হাতে? এরা কি আসলে কোন আদর্শের জন্য রাজনীতি করে? উত্তর নিশ্চয় না। প্রবাদ আছে, ‘কাকের মাংস কাকে খায় না’। কিন্তু একজন ছাত্র রাজনীতির কর্মী নিজ আদর্শের আরেকজনকে সামান্য ব্যক্তিস্বার্থের জন্য নিমিষেই খেয়ে ফেলতে পারে। বিগত এক বছরের ঘটনা পরিক্রমা হিসেব করলেই এর বাস্তব প্রমাণ মিলেবে।

সময় এসেছে দেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সচেতন মহল, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ সহ সবাইকে এই অবস্থার দিকে জরুরি ভিত্তিতে নজর দেওয়ার। সবার আগে রাজনৈতিক নেতৃত্বে শুভবুদ্ধির উদয় হবে- সেটাই প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক