তিন যুগে বাংলাদেশের তিন নারী বৈমানিকের আত্মত্যাগ

(বা থেকে) পাইলট কানিজ ফাতেমা রোকসানা, পাইলট ফারিয়া লারা ও প্রিথুলা রশিদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে যাত্রীবাহী বানিজ্যিক বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণহানীর ঘটনা খুব কম। এখন পর্যন্ত দেশের মাটিতে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা ১৯৮৪ সালে ঢাকায় বিমানবন্দরের কাছের জলাভূমিতে যাত্রীবাহী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৪৯ জন যাত্রীর মৃত্যু হয়। সেসময় অন্যান্য যাত্রীদের সাথে নিহত হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম বানিজ্যিক লাইসেন্সপ্রাপ্ত পাইলট কানিজ ফাতেমা রোকসানা। তবে তার আগে ৭ বছর দক্ষতার সাথে বানিজ্যিক বিমান পরিচালনার রেকর্ড ছিলো এই পায়োনিয়ারের।

এর বাইরে ৯৮ সালে সেসনা প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় পুরান ঢাকার পোস্তগোলায় সহযোগী পাইলট রফিকুল ইসলামসহ নিহত হন প্রশিক্ষণার্থী পাইলট ফারিয়া লারা। তিনি ছিলেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের মেয়ে। সেকারণেই হয়তো সেসময় এ ঘটনা বেশ মিডিয়া কাভারেজ পেয়েছিলো। সেলিনা হোসেন পরবর্তীতে নিজের প্রয়াত কন্যাকে নিয়ে ‘লারা’ নামে একটি সাড়াজাগানো বই লিখেন। সেটিও বেষ্টসেলার ছিলো।

সর্বশেষ সোমবার নেপালের কাঠমান্ডুতে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএসবাংলার ড্যাশ-৪ বিমান দুর্ঘটনায় নিহতের মধ্যে আছেন মহিলা পাইলট ফার্স্ট অফিসার পৃথুলা রাশিদা। তিনি মূল পাইলট আবিদ সুলতানের সহযোগী হিসেবে ফ্লাইট পরিচালনা করছিলেন। সাধারণত এ ধরণের প্লেন ক্রাশে কেউ বাঁচে না, তবে শুধুমাত্র পাইলটদের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া চেষ্টা ও দক্ষতায় এ দুর্ঘটনায় বেঁচে গেছেন ১৭ জন। সেই সাথে দুর্ঘটনায় নিভে গেছে সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের তরুণ বৈমানিক প্রিথুলা রশিদের জীবন প্রদীপ। কিন্তু জীবনের বিনিময়ে বীর ওই নারী পাইলট বাঁচিয়ে গেছেন ১০ নেপালি যাত্রীর প্রাণ।

নেপাল ভিত্তিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও সামাজিক মাধ্যমে এই বীর নারীকে ‘ডটার অব বাংলাদেশ’ আখ্যা দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রিথুলা ছিলেন সোমবার বিধ্বস্ত হওয়া ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজের সহকারি পাইলট। শুধু তাই নয়, ইউএস বাংলার প্রথম নারী পাইলট ছিলেন তিনি।

উড়োজাহাজটিতে ৬৭ যাত্রীর পাশাপাশি ৪ জন ক্রু ছিলেন বলে ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সেই হতভাগাদেরই একজন প্রিথুলা রশিদ।

দুর্ঘটনা কবলিত বোমবার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ৪০০ উড়োজাহাজটিতে ৩৭ জন পুরুষ ও ২৭ জন নারী ছাড়াও উড়োজাহাজটিতে ছিল শিশু। দুর্ঘটনায় নিজের কথা না ভেবে আগে সেই যাত্রীদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন প্রিথুলা। দশ জন নেপালি যাত্রীকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে নিরাপদে সরিয়ে দিতে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করতে করতেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় প্রিথুলার।

তবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রিথুলা রশিদের অন্যের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা ব্যর্থ হয়নি। ওই দশ নেপালি যাত্রীর সবাই দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছে। তারা সবাই এখন বেঁচে আছে।