জামায়াতের প্রার্থীতা : দর কষাকষি না শক্তি প্রদর্শন?

অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের

সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে পুঁজি করে চলছে বিএনপি-জামায়াতের ‘দর কষাকষি’। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেও সিলেটে বিএনপির সাথে পাল্লা দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় নামে ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিএনপির একাধিক প্রার্থীর সাথে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন জামায়াতে ইসলামী সিলেটের আমির অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তবে এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা জামায়াতের মূল লক্ষ্য না হলেও সিটি নির্বাচনকে কাজে লাগিয়ে তারা জোট থেকে আদায় কর নিতে পারে সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সংসদীয় আসন। আর এ কৌশলকে কাজে লাগানোর পথেই এখন হাঁটছে জামায়াতে ইসলামী।

রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল রয়েছে। ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এ অবস্থায় জামায়াতে ইসলামী জোটের হয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে। এ লক্ষ্যেই গাজীপুরের মতো সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কাজে লাগিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচনে জোট থেকে জামায়াতে ইসলামীর জন্য কয়েকটি আসন আদায়ের লক্ষ্যেই বিএনপি প্রার্থী আরিফের সাথে পাল্লা দিতে নেমেছেন সিলেট জামায়াতে ইসলামীর আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

এ লক্ষ্যে সংসদীয় আসন সিলেট-৫, সিলেট-৬ এবং সিলেট-৩ আসন জোট থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায়ের জন্য এক ধরনের স্নায়ু চাপেই রাখা হচ্ছে বিএনপিকে। সিলেটের এ ৩টি সংসদীয় আসন জামায়াতে ইসলামীকে দেওয়া হবে বিএনপি থেকে- এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেই কেবল জামায়াতে ইসলামীর এ আমির প্রার্থীতা প্রত্যাহার করবেন বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। একই সাথে মেয়র প্রার্থী ঘোষণার মাধ্যমে জামায়াতের কয়েকজন কাউন্সিলরের বিষয়ে যাতে বিএনপি সমঝোতায় আসে, সে বিষয়টিও আছে হিসেবে।

তবে বিএনপি এসব বিষয়ে খুব একটা কর্ণপাত করছে না। এ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, “এরকম কোন কিছু আমি মনে করছি না। জামায়াত থেকে উনি (জুবায়ের) নির্বাচনে অংশ নিতে চাচ্ছেন। এসব বিষয়ে স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে যেহেতু কেন্দ্র একজনের (আরিফুল হক চৌধুরী) নাম ঘোষণা করেছে, সুতরাং কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত সবাইকেই মেনে নিতে হবে।”

এদিকে, মেয়র প্রার্থী জামায়াতে ইসলামী সিলেটের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের দেশের অন্যান্য জায়গায় ছাড় দেওয়া হলেও সিলেটে কোন ছাড় দেওয়া হবে না জানিয়ে সিলেট ভয়েসকে বলেন, “২০ দলীয় জোটের অন্যতম একটি দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী থেকে আমি মেয়র পদে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। এ লক্ষ্যে আমি জোটের সমর্থনও চেয়েছি। আশা করি জোট আমাকে সমর্থন জানাবে। দেশের মোট ১২টি সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে আমরা শুধু সিলেট সিটি কর্পোরেশনই চেয়েছি। বাকি সবগুলোতেই বিএনপি নির্বাচন করেছ, কিন্তু সিলেটের ক্ষেত্রে এটা হবে না।”

জোট সমর্থন না দিলে কিভাবে নির্বাচন করবেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “জোট যদি সমর্থন না দেয়, তাহলে আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সিলেট নাগরিক ফোরামের সমর্থন নিয়েই নির্বাচন করবো।”

বিএনপির সাথে দর কষাকষির বিষয়ে তিনি বলেন, “এখানে দর কষাকষি কিছু না। আমি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। আর দর কষাকষির বিষয়ে আমার কোন কিছু জানা নেই।”

গাজীপুরে জামায়াত-বিএনপির সমঝোতার বিষয়ে তিনি বলেন, “গাজীপুরে মূলত জোটের স্বার্থে জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচন প্রত্যাহার করেছেন। এখানে কোন সমঝোতা আছে বলে আমার জানা নেই। তবে সিলেটে আমি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি- এটুকু আমি বলতে পারবো।”

এর আগে, ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জামায়াতের এ নেতা মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েও শেষমেশ প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে বিএনপির সাথে সমঝোতা করেছিলেন। তবে এবারের নির্বাচনে জামায়াত চাইলেও বিএনপি তাতে কর্ণপাত করবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তবে সিলেট জামায়াতের এ আমির জোটের স্বার্থে এবং আগামী নির্বাচনে জোট থেকে জামায়াতের প্রার্থীকেই মেয়র প্রার্থী হিসেবে সমর্থন করা হবে- এমন আশ্বাসে ২০১৩ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি উল্লেখ করে বলেন, “২০১৩ সালে যখন নির্বাচন হয়, তখন আমি কারাগারে থেকে কেন্দ্রের নির্দেশে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিএনপি থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছিলো যে এর পরের নির্বাচনে আমাদেরকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে। তাই তখন কেন্দ্রের নির্দেশে আমি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে আরিফুল হককে সমর্থন জানিয়েছিলাম।”

তিনি আরো বলেন, “এবার জোট থেকে আমি ছাড়াও বিএনপির দুইজন প্রার্থী রয়েছেন। তবে গত নির্বাচনে যেহেতু আমাদেরকে আশ্বস্ত করা হয়েছিলো, সেহেতু এবার জোট থেকে একটি ইনসাফ করা হবে ইনশাআল্লাহ।”

এদিকে, বিএনপি থেকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় সদস্য ও সদ্য সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে। দল থেকে আরিফুল হককে মনোনয়ন দেওয়া হলেও কেন্দ্রের মনোনীত এ প্রার্থীর বিদ্রোহী হয়েছেন সিলেট মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম। তিনিও মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে আছেন প্রতীক পাওয়ার অপেক্ষায়।

অন্যদিকে, সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। বুধবার (৪ জুলাই) বিকালে বিএনপি চেয়ারপার্সনের গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জোটের সমন্বয়ক নজরুল ইসলাম খান এ ঘোষণা দেন। একক প্রার্থী হিসেবে এখনো কারো নাম ঘোষণা করা না হলেও সিলেটে জোটের প্রার্থী হিসেবে আরিফুল হক চৌধুরীর নামই আলোচনায় রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগামী ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত হবে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এ নির্বাচনে প্রার্থীতার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শেষ হয়েছে। প্রার্থীতা প্রত্যাহার করা যাবে আগামী ৯ জুলাই পর্যন্ত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জামায়াত বিএনপির মধ্যে দর কষাকষি চলছে বলে মনে করলেও শেষ পর্যন্ত জামায়াত প্রার্থীতা প্রত্যাহার করবে, নাকি নির্বাচনের মাঠে থেকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করবে- তা জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে ৯ জুলাই পর্যন্ত।