‘জান দেব তো জবান দেব না’

সিলেটে প্রতিনিয়ত অনেক নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে, নাটকের উৎসব চলছে, হচ্ছে নিয়মিত মহড়া। সব মিলিয়ে সিলেটে নাটকের মেলা বসেছে। একটার পর একটা মেলা হচ্ছেই। মঙ্গলবার রিকাবীবাজারস্থ কবি নজরুল অডিটোরিয়ামে ‘বরাক-সুরমা নাট্য উৎসব’-এ মঞ্চস্থ হলো ভারতের শিলচরের গণ-সুর সাংস্কৃতিক সংস্থা’র নাটক ‘লিগ্যাসী কোড ১৯-০৫-১৯৬১’। নাট্যকার অরিজিৎ আদিত্য ও নির্দেশক অভিনেতা সুব্রত রায়ের প্রতিভা কাগজের পাতায় ফুটিয়ে তোলা অত্যন্ত কঠিন।

নাটকটির মোদ্দা গল্পটি বাস্তব। লিগ্যাসি কোডের জন্য একজন নমশূদ্র ট্রেনের নিচে পড়ে আত্মহত্যা করেন। তাঁর নাম ছিল অর্জুন। এই ইতিহাস সত্য ঘটনাকে নাটকের রূপ দিয়েছেন অরিজিৎ আদিত্য। যদিও তিনি নাটকের অর্জুনকে মারেন নি। বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু নাটকের মাধ্যমে তুলে এনেছেন বিস্তর গল্প ও ইতিহাস।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের করুণ দৃশ্য থেকে শুরু করে ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন ঠাঁই পেয়েছে নাটকে। অর্জুনের দাদা ঠাকুর যখন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের ফলে মিজান চাচাকে ফেলে যাচ্ছিলেন তখনকার করুণ দৃশ্য দর্শককে নিরব করে তুলেছে। কিংবা যখন অর্জুনের দাদির গল্পে ছোট্ট একটা বাড়ি, একটা পুকুর ও বাগানের গল্প বলেছেন যা মনে হয়েছে জীবন্ত।

কিছু সময়ের জন্য দর্শকদের শান্ত আবেগী করে তুলেছে যখন অর্জুন মায়ের উদ্দেশ্যে একান্ত কথা বলে। ‘আমার ডর লাগে, মা আমার বড় ডর লাগে’ একেবারে হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষার জন্য প্রাণ দেয়া সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারের নাম উঠে এসেছে। উঠে এসেছে ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচরে ‘জান দেব তো জবান দেব না’ আন্দোলনের ইতিহাস। উঠে এসেছে ১১ জন শহীদের নাম। এমনকি একসময় অর্জুনের কল্পনায় সামনে এসে শক্তি যোগায় শিলচরের ভাষা শহিদ কমলা।

অর্জুন চরিত্রের অভিনেতা ও নাটকের নির্দেশক সুব্রত রায় জানান, ‘নাটকটি প্রথমবার মঞ্চস্থ হয়েছিল দিল্লীতে। শিলচরে নিয়মিত প্রদর্শীত হয়। এ নাটকের পটভূমিকা, সেটা বরাক উপত্যকার তো বটেই গোটা আসামের সবারই জানা। তবে ভারতবর্ষের বেশির ভাগ লোকই এ নিয়ে খুব একটা কিছু জানেন না। গল্পের মুখ্য চরিত্র অর্জুন নমশূদ্র এক ‘ডি-ভোটার’। এই ‘ডি-ভোটার’ বা ডাউটফুল ভোটার শব্দটি আসামের বাঙালিদের জন্যে আতঙ্কের অপর নাম। কারো নামে একবার যদি এই ‘ডি-ভোটার’ নোটিশ আসে, তবে তিনি নিজভূমেই পরবাসী হয়ে গেলেন। তাঁকে এবার আদালতে প্রমাণ করতে হবে তিনি ভারতের নাগরিক।’

নাট্যকার অরিজিৎ আদিত্য যোগ করে বলেন, ‘গৌহাটি হাইকোর্টের আদেশ মত বিচার না হওয়া পর্যন্ত ‘ডি-ভোটার’দের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক করে রাখতে হয়। রাজ্যের অনেক জায়গায় জেলগুলিকেই ডিটেনশন ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে, যার নাগরিকত্ব সন্দেহজনক তাকে বন্দীজীবন কাটাতে হতো চোর, ডাকাত, খুনীদের সাথে। বছরের পর বছর এভাবে বিনা বিচারে বন্দী জীবন কাটানোর পর কেউ কেউ মারা যাচ্ছেন, নয়ত আত্মহত্যা করেছেন।’

নাটকের অর্জুনকে নাট্যকার বাস্তব জীবন থেকেই ধার করেছেন। বাস্তবের অর্জুন নমশূদ্র যদিও শেষমেশ আত্মহত্যার পথই বেছে নিয়েছিলেন, নাটকের অর্জুন কিন্তু তা করেন নি। নাট্যকার খুব গুছিয়ে অর্জুন নমশূদ্রের গল্পটা বলেছেন। শিলচরের ভাষা শহিদ কমলার অনুপ্রেরণায় সমস্যার সমাধান কোন পথে, সব শেষে তাও বলেছেন।

হাওর থেকে মাছ ধরে অর্জুন তার সংসার চালাত। নিজের লিগ্যাসি কোড না জানলে এনআরসি’র খাতায় নাম উঠবে না। নিজেকে এ দেশের নাগরিক বলে প্রমাণ করা যাবে না। অর্জুন তাই হন্যে হয়ে তার নিজের শেকড়কে খুঁজছিল।

নাটকের পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল দেশভাগের যন্ত্রণা। শুধু মাটি দিয়ে তো একটা দেশ গড়ে ওঠে না। তার সাথে জুড়ে থাকে সেখানকার মানুষের সুখ, দুঃখ, আবেগ, ভালোবাসা। সেই আবেগ যে কতবার খন্ডিত হয়েছে, অপমানিত হয়েছে, রক্তাক্ত হয়েছে তার হিসেব হয়তো ইতিহাসে নেই বা থাকবেও না। এই নাটকটি যেন তার এক অসামান্য দলিল হয়ে রইল।

দেশ ভাগ হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। নাট্যকার কিন্তু সব শেষে মেসেজ দিলেন ধর্ম নয়, ভাষাই হচ্ছে আমাদের আসল ঐতিহ্য, আমাদের অকৃত্রিম লিগ্যাসি। তার কোড ১৯ মে, ১৯৬১। ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে সেদিন এগারোটি তাজা প্রাণ শহীদ হয়েছিল। শুধু অর্জুন নয়, শিলচরের সবারই ওই একই লিগ্যাসি কোড : ১৯-০৫-১৯৬১।

নেতার চরিত্রে বিভাস রায় ও শহীদ কমলা ভট্টাচার্যর ভূমিকায় রুমি রায় যথাযথ। একটু সময়ের জন্য মঞ্চে উপস্থিত হয়েও প্রমাণ করেছেন। এক ঘণ্টা দশ মিনিটের নাটকে এই দুজনকে মঞ্চে দেখা গেছে যথাক্রমে তিন মিনিট ও পাঁচ মিনিট।

সুব্রত রায় একাই দশটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এতগুলি চরিত্রে রূপদান করে সুব্রত রায় অভিনয়ের ব্যাপারটাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। হলভর্তি দর্শক হাঁ করে সুব্রত রায়ের কান্ডকারখানা দেখছিলেন। কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের মঞ্চে তিনি যে একাই অভিনেতা, তা কাউকে বুঝতেই দিলেন না। সমস্ত চরিত্রগুলো মঞ্চ জুড়ে চলাফেরা করছে, সংলাপ বলছে।

কস্টিউম, মঞ্চসজ্জা, প্রপস এসবের চিন্তা না করে শুধুমাত্র দর্শকের কল্পনা শক্তির ওপর নিজের প্রভাব বিস্তার করলেন। অভিনয় একটা শিল্প, সুব্রত রায় আবার নতুন করে তা প্রমাণ করলেন। এমন কি আবেগময় দৃশ্যেও তিনি ছিলেন সমান স্বচ্ছন্দ। দিদিমার অর্জুনকে বুকে জড়িয়ে ধরা কিংবা মিজান চাচা ও অর্জুনের কোলাকুলির দৃশ্য প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। মনে হয়েছে এরা মঞ্চে উপস্থিত। তবে অভিনেতার ডানে-বামে হাঁটা চোখে লেগেছে। অভিনেতা কিছু জায়গায় আলো (লাইট) ঠিকঠাক মত নিতে পারেন নি। কিছুটা সরে গেছেন।

সেবায়ন রায় চৌধুরীর আবহ বেশ ভালো। তবে ঠিক সময়মত দুএকটি জায়গায় শব্দগুলো পাওয়া যায়নি। এমনকি দৃশ্যের প্রয়োজনের আবহ সংগীত ঠিকঠাক জায়গায় ফেলতে দেরি করেছেন। গানগুলো শুনে মনে হয়েছে- এগুলোতো আমাদেরই। আমাদের স্থানীয় অর্থাৎ সিলেটের শিতালং শাহ’র গানটি সবচেয়ে ভাল হয়েছে।

এ কাহিনী তো একা অর্জুন নমশূদ্রের নয়, এ গল্প বাঙালি হিসেবে আমাদের সবার গল্প। ধন্যবাদ নাট্যকার অরিজিৎ আদিত্য এবং নির্দেশক ও মুখ্য অভিনেতা সুব্রত রায়, অভিনেতা বিভাস রায় ও রুমি রায়কে। নাটকটিতে শব্দ পরিকল্পনা করেছেন সুব্রত রায়, শব্দ প্রক্ষেপণের দায়িত্বে ছিলেন সেবায়ন রায় চৌধুরী, আলোক পরিকল্পনা করেছেন দেবজ্যোতি রায় আর মঞ্চ পরিকল্পনা করেছেন রাজকুমার রায়।