গ্রামের প্রথম এইচএসসি পাশ শাল্লার পাবেল

অভাব আর অপবাদ ভাঙতে পারেনি তার মনোবল

শাল্লা উপজেলার নারকিলা গ্রামের কেউ স্কুলে গেলে তাকে ‘চোরের গ্রামে’ ছেলে বা মেয়ে হিসেবে অখ্যায়িত করে তাদের সাথে কেউ মিশত না। সেই সাথে বলত ও চোরের গ্রামের, ওর সাথে মেশা যাবে না, মিশলে আমরা খারাপ হয়ে যাব; এই বলতো অন্য গ্রামের ছেলে মেয়েরা।

অন্যদের এমন মনোভাবে মনোবল ভেঙে অনেকেই লেখা পড়া ছেড়ে দিত। সেই সাথে দ্রারিদ্রতা তো ছিলই। মূলত এই দুই কারণে লেখাপড়া করা হত না নারকিলা গ্রামের ছেলে মেয়েদের। কিন্তু বর্তমানে তাদের গ্রামের লোকজন এখন আর চুরি করে না। সবাই বুঝতে পেরেছে যে এই কাজ ভাল না। কিন্তু তাদের গ্রামের ‘চোরা বস্তির’ অপবাদ টি এখনও রয়ে গেছে।

সেই অপবাদ পাওয়া শাল্লা উপজেলার ‘নারকিলা’ গ্রামের আব্দুর রহমানের বড় ছেলে পাবেল আহমেদ।

এর আগে দুর্গম হাওরবেষ্টিত এই এলাকার কেউ স্কুলের গন্ডি পেরুতে পারে নি দারিদ্রতা ও অন্য গ্রামের লোকজনের অবহেলার কারণে।

তবে চোরের গ্রামের অপবাদ এবং দারিদ্র্যের কষাঘাত পেছনে ফেলে পাবেলই এবার তার গ্রাম থেকে প্রথম এইচএসসি পাশ কোন ছেলে। সে দিরাই ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষায় ৩.০৮ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। তার এই সাফল্য এ গ্রামের সবাই অনেক খুশি হয়েছে। কারণ সেই প্রথম তার গ্রামের এইচএসসি পাশ ছেলে।

পাবেল দুই বছর আগে শাল্লার শ্যাম সুন্দর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৩.২৮ পেয়ে এস এস সি পাশ করে। পাবেলের বাবা তার পড়াশোনার খরচ দিতে না পারার কারণে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়া তার প্রায় বন্ধের পথে ছিল। ঐ সময় তৎকালীন সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ তার উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনার সকল খরচের দায়িত্ব নেন।

পরে নতুন পুলিশ সুপার বরকত উল্লাহ খান যোগদানের পর তিনিও তাকে অর্থিক সহযোগিতা করেন। কিন্তু এবার এইচএসসি পাশ করার পর কেউ সহযোগিতা করবে কিনা তা এখনও জানে না পাবেল। না হলে কিভাবে সে উচ্চ শিক্ষা নিবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে সে।

ইতোমধ্যই সে চাকরি খোঁজা শুরু করে দিয়েছে। যে কোন চাকরি পেলে সে কাজ করতে চায়। তবে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি চাকরি করতে চায় সে। আর পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যেতে চায় পাবেল।

সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিষয়ে (অনার্স) পড়তে চায় দ্ররিদ্র এই শিক্ষার্থী। তার চাচা আব্দুর রহিম অনেক আগে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর আর বেশি দূর পর্যন্ত যাওয়া হয় নি। মূলত তার উৎসাহেই পাবেল অনেক কষ্ট হওয়ার পরও পড়াশোনা চালিয়ে গেছে।

তার পরিবার গ্রামের নিতান্তই একটি গরীব পরিবার। তার বাবা কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার মা আমিনা বেগম ঘরে গৃহস্থালীর কাজ করেন। ৩ ভাই ভাই দুই বোনের মধ্যে এক বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। আর অন্য ছোট ভাই বোনের মধ্য দুই ভাই শাল্লার শ্যাম সুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে।

ছোট বোন পারিবারিক সমস্যার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। পাবেলের স্বপ্ন এখন ভাল একটা চাকরি। যাতে সে তার পরিবাররকে অর্থনৈতিক ভাবে সহযোগিতা করতে পারে এবং তার ছোট ভাই ভালভাবে পড়াশোনা করাতে পারে।

পাবেল আহমেদ বলেন, ‘আমি দ্ররিদ্র পরিবারের ছেলে। অনেক কষ্ট করে বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় এই পর্যন্ত এসেছি। পুলিশ সুপার সহ অনেকেই আমাকে পড়ার জন্য সহযোগিতা করেছেন। আমি আরও পড়াশোনা করতে চাই আমাকে সবাই আগের মত সহযোগিতা করেন সেই কামনা করি। সেই সাথে পড়াশোনার পাশাপাশি যদি একটি চাকরি পেয়ে যাই তাহলে কাজ করে অনেক খরচ পুষিয়ে নিতে পারবো।

দিরাই ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রদীপ কুমার দাস বলেন, আমরা পাবেলের বিষয়ে জানতাম সে দ্ররিদ্র পরিবারের ছেলে। টাকা পয়সা খরচ করে তার পড়াশোনা করা মত সামর্থ নেই। সে কারণে আমরা বোর্ড ফি ছাড়া অন্য কোন ফি নেয়া হয় নাই। পরীক্ষার ফি সেশন ফি সহ সকল প্রকার ফি মওকুফ করা হয়েছে তাকে। সে যাতে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে সে জন্য বিত্তবানরা তাকে সহযোগিতা করবেন সে প্রত্যাশা করছি।

শাল্লা হবিপুর ইউনিয়নের ২ নং ওয়ার্ডের সদস্য এলাছ মিয়া বলেন, সে যদি আমাদের কাছে সহযোগিতা চায় আমরা তাকে অবশ্যই সাহায্য করব। তার মত ঐ গ্রামের আরও ছেলে যাতে পড়াশোনা করে এগিয়ে যেতে পারে আমরা সেটা চাই।