গোয়াইনঘাটে ভাঙনের কবলে পাঁচ শতাধিক পরিবার

সিলেটের গোয়াইনঘাটে পিয়াইন ও সারি নদীর তীরবর্তী এলাকার ১৫টি গ্রামে ভয়াবহ নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে এসব গ্রামের কয়েক’শ পরিবারের ঘরবাড়ি স্কুল-মাদ্রাসা ও ফসলি জমি ভাঙনের কবলে রয়েছে। বসত বাড়ি ও ফসলি জমি নদীতে ধসে পড়ার আশঙ্কায় চরম উৎকন্ঠা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন নদী ভাঙন কবলিত এলাকার প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে প্রতি বছর নদী ভাঙনের শিকার হয়ে গৃহহীন হয় এ অঞ্চলের প্রায় অর্ধ শতাধিক পরিবার।

জানা যায়, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষন ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে পিয়াইন ও সারী নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে পিয়াইন ও সারী নদীর পানির প্রবল স্রোতে নদী তীরবর্তী এলাকার দশটি গ্রামের বেশিরভাগ পরিবারের সর্বস্ব নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

বিগত ১৫ বছরে এ অঞ্চলের স্কুল, মসজিদ, কবরস্থানসহ কয়েক শতাধিক ঘর বাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের সানকি ভাঙ্গা, আসাম পাড়া, মুমিনপুর, নয়াগাঙ্গের পার ও বাউরবাগ হাওর গ্রামের অস্তিত্ব বিলীন হতে চলেছে। এসব গ্রামে কিছু সংখ্যক বসতি থাকলেও সেগুলো প্রায় ধ্বসে যাবার উপক্রম।

এছাড়া গত ২৪ জুন থেকে আকস্মিক বন্যায় উপজেলার সানকি ভাঙ্গা, মমিনপুর, বাউরবাগ, নয়াগাঙ্গেরপার, বাংলাবাজার, আসাম পাড়া, আসাম পাড়া হাওর, ছৈলাখেল অষ্টম খন্ড, নবম খন্ড, বুধিগাঁও ও নাইন্দার হাওরসহ ১৫টি গ্রামের রাস্তাঘাট, স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা ও ফসলি জমিসহ সারী ও পিয়াইন নদীর তীরবর্তী এলাকার প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিবার বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন।

বাউরবাগ গ্রামের গৃহহীন পরিবার সদস্য আমজাদ মিয়ার ফসলি জমি ও বসতবাড়ির কিছু অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে একটি টিনের ঘরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাস করছেন। এক সপ্তাহ ধরে নদীতে ভাঙন দেখা দেওয়ায় তার দিন কাটছে আতঙ্কে। তিনি জানান, ‘নদী আমার সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। কোথাও আশ্রয়ের জায়গা না পেয়ে নদীর তীরেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আছি। আকাশে মেঘ দেখলেই কলিজার পানি শুকিয়ে যায়। ভয়ে রাতে ঘুম আসে না।’

এ ব্যাপারে ৩নং পূর্ব জাফলং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফুর রহমান লেবু বলেন, সানকীভাঙ্গা হাওর, আসামপাড়া, আসামপাড়া হাওর, চৈলাখেল ৯ম খন্ড, চৈলাখেল ৮ম খন্ড, বাউরভাগ হাওর, নয়াগাঙ্গের পারসহ বিভিন্ন স্থানে সারী ও পিয়াইন নদীর পানি গ্রামে ঢুকে পড়ায় জলাবদ্ধতা এবং ভাঙ্গনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় কৃষি জমি, জনবসতি এবং সড়ক যোগাযোগ হুমকির মুখে পড়েছে। সানকীভাঙ্গা দক্ষিণপাড়ায় হিদাইরখালের চরম ভয়াবহতায় ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে বিশাল এলাকা। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে আমি বাঁশ এবং কাঠের আড়া দিয়ে বেড়িবাঁধ-কাম সড়কটি রক্ষার চেষ্টা করছি। বিভিন্ন স্থানে ভাঙ্গন-খানাখন্দ, অবস্থা পরিবর্তনে অর্থ বরাদ্ধ দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। বিষয়টি দ্রুত সমাধানে উদ্যোগ নিয়ে অত্রাঞ্চলের জানমাল রক্ষায় আমি সরকারের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম সরকার বলেন, পিয়াইন ও সারি নদীর তীরবর্তী এলাকা আমি পরিদর্শন করেছি। দুইটি নদীর তীরবর্তী এলাকাই ভাঙনপ্রবণ। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ব্যাপক ভাঙন হয়। এ বছর আগে থেকেই ভাঙন দেখা দিয়েছে। চলমান এবং পূর্বে কোন বরাদ্দ না থাকায় দূর্যোগ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছেনা। তবে ভাঙন রোধে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে যা এখনও প্রক্রিয়াধীন। আগামীতে বরাদ্ধ আসলে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত কুমার পাল জানান, পিয়াইন ও সারি নদীর বন্যা পরবর্তী সময়ে ভাঙন কবলিত এলাকার ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ নির্ধারন করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল থেকে বরাদ্ধ আসলে অচিরেই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।

তবে এসব আশ্বাসে নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না এলাকার সাধারণ মানুষ। পিয়াইন নদীর তীরবর্তী মমিনপুর গ্রামের বাসিন্দা মো.আলহাজ মিয়া জানান, নদী ভাঙনে গত কয়েক বছরে আমাদের গ্রামের ফসলি জমিসহ ৪০টি বাড়িঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। এবারের বন্যায় আবারও ভাঙন শুরু হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সব সময় আতঙ্কে থাকি। ভাঙতে ভাঙতে আমার বাড়িটিও কখন নদীতে বিলীন হয়ে যায়।