‘ক্লিন ইমেজের’ আসাদ না ‘জনতার’ কামরান?

সিসিক নির্বাচন : কে পাচ্ছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান (বায়ে), আসাদ উদ্দিন আহমদ (ডানে)

দরজায় কড়া নাড়ছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচন। ঘোষণা হয়ে গেছে নির্বাচনী তফসীল। তবে এখনো চুড়ান্ত হয়নি আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন। এ অবস্থায় সিসিক নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কে হবেন নৌকার মাঝি এ নিয়ে চলছে নানা হিসেব নিকেশ।

নির্বাচনকে সামনে রেখে দলীয় হাইকমান্ডের চোখ এখন সিলেটের দিকে। বিষয়টি মাথায় রেখে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন সাবেক সিসিক মেয়র, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও মহানগর সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এবং মহানগর সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। চলছে পাড়া-মহল্লায়, মসজিদে মসজিদে প্রচারণা। এর মাঝে আসাদ সমর্থকেরা ‘আর নয় পুরাতন, এবার চাই পরিবর্তন’ এই স্লোগান নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া কাঁপাচ্ছেন। আর কামরান অতীতের মতো দেখাচ্ছেন নগর উন্নয়নে মাস্টার প্ল্যানের স্বপ্ন।

নির্বাচনী পরীক্ষার দিনক্ষণের আরো প্রায় মাস দেড়েক মাস বাকি থাকলেও এখন পর্যন্ত যোগ্যতার পরীক্ষাই দিয়ে যাচ্ছেন প্রধান দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এবং আসাদ উদ্দিন আহমদ। যদিও এর আগে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তাকে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচন করার সবুজ সংকেত দিয়েছেন বলে কামরান বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে বলে আসলেও দলীয় প্রধানের কথা কামরানের পক্ষে সবুজ সংকেট বুঝায় না বলে তা উড়িয়ে দিয়েছেন প্রার্থীতার আরেক দাবিদার আসাদ উদ্দিন আহমদ। কথার যুদ্ধে যে যতোই এগিয়ে থাকেন শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যের শিকে ছিড়বে তা নিয়ে নেতাকর্র্মী ও জনমনে জল্পনা কল্পনার শেষ নেই।

কামরান-আসাদের পাশাপাশি মহানগর আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সদস্য ব্যবসায়ী মাহিউদ্দিন আহমদ সেলিম প্রার্থীতার দৌঁড়ে লাইনে রয়েছেন। তবে শেষ বাঁশি বাজার আগেই এ দুজন নিজেদেরকে গুটিয়ে নেবেন বলে ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

প্রচারণায় কামরান

বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বিগত সময়ে টানা দু’বারের সিটি মেয়র। এর আগে ছিলেন (সিটি করপোরেশন ঘোষণার আগে) আরো একবারের পৌর মেয়র। রয়েছেন আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং মহানগরের সভাপতির দায়িত্বে। একাধিকবার বিপুল ভোটে জয়লাভের কারণে তাঁকে অনেকে ‘জনগণের কামরান’ও বলে থাকেন। ফলে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নের প্রধান দাবিদার তিনি।

গত সিসিক নির্বাচনে তিনি আরিফুল হক চৌধুরীর কাছে বড় ব্যবধানে হারলে মাঠ ছাড়েননি। নতুন করে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু না থাকলেও জনসমর্থন চাঙ্গা রাখতে চষে বেড়াচ্ছেন শহরের এমাথা থেকে ও’মাথা।

মঙ্গলবার (১২ জুন) আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়া নিয়ে কথা হয় বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের সাথে। আলাপকালে তিনি বলেন- ‘আমি আওয়ামী লীগের একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন যাবৎ এই সিলেটের জনগণের সুখে-দুখে তাদের পাশে আছি। সিলেটের মানুষের সাথে আমার একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। সিলেটের মানুষের ভালোবাসায় এ পর্যায়ে এসেছি। এ সব বিবেচনা করে দল আমাকে মনোনয়ন দেবে।’

এ সময় মনোনয়ন পেলে বিজয়ের আশাবাদ ব্যক্ত করেন কামরান। বলেন- বিগত সিটি নির্বাচনে জনগণ তাকে পরিবর্তন করেছে এবার জনগণ চাইলে তাকে প্রত্যাবর্তনও করাতে পারে।

দলের মধ্যে আরো দু’একজন মনোনয়ন প্রত্যাশি রয়েছেন, এক্ষেত্রে তাদের সাথে সম্পর্কের অবনতি হবে কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন- ‘আমার কাছে আমার সংগঠনটাই বড়। আমাকে আমার সংগঠনকে ধরে রাখতে হবে, নেতাকর্মীদের নিয়ে আমার রাজনীতি পরিচালনা করতে হবে। আর নির্বাচন হচ্ছে রাজনীতির একটা অংশ। নির্বাচনের কারণে যাতে কোনো অবস্থায় সম্পর্কে ভাটা না পড়ে সেই লক্ষ্যে কাজ করবো।’

সংগঠনের স্বার্থে দৈর্য্য দিয়ে বিগত দিনে সবার সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আগামীতেও সেই সম্পর্ক বজায় রেখে চলবেন বলে জানান।

প্রচারণায় আসাদ উদ্দিন আহমদ

অপরদিকে নির্বাচনের সময়কাল যতো এগিয়ে আসছে ততো বেশি বাড়ছে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ। এই দৌড়ঝাঁপে চলছে নিজেকে প্রার্থী হিসেবে শ্রেষ্ঠ প্রমাণের চেষ্টা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ। আপাদমস্তক ‘ক্লিন ইমেজের’ মানুষ হিসেবে তাঁর সুনাম রয়েছে শহরজুড়ে। আসাদ উদ্দিনের সমর্থকরা তাঁর এই ‘ক্লিন ইমেজকে’ পুঁজি করে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রচারণা। আজ এ এলাকা তো কাল ও এলাকা। মানুষের সাথে মিশছেন, কথা বলছেন। জানান দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে তার নির্বাচন করার কথা।

আওয়ামী লীগ থেকে নিজের মনোনয়ন পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন- ‘আমি নির্বাচন করার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। আমাকে নিয়ে নগরবাসীর যে উৎসাহ উদ্দীপনা দেখেছি এতে আমি শতভাগ আশাবাদী যে নেত্রী আমাকে মনোনয়ন দেবেন।’ দলীয় মনোনয়ন যদি দেওয়া হয় তাহলে তিনিই বিজয়ী হবেন বলে আশাবাদ করেন।

মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে কেন আশাবাদি এমন প্রশ্নে আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন- ‘আমি আশাবাদি এ কারণে যে সিলেটের মেয়র পদটা আওয়ামী লীগেরই ছিলো। কামরান সাহেব মেয়র থাকাকালে মহানগর আওয়ামী লীগেরও সভাপতি ছিলেন। কিন্তু তিনি সাংগঠনিকভাবেও ব্যর্থ হয়েছেন। এছাড়া সিটি মেয়র হিসেবেও সিলেটের জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারেননি। যে কারণে সাংগঠনিকভাবে ও জনগণের কাছে তাঁর অবস্থা খুবই নাজুক। এ অবস্থায় তৃণমূল নেতাকর্মীরা পরিবর্তনের পক্ষে। তারা চায় নতুন কাউকে দিয়ে সিটি মেয়রের পদটা পুনরুদ্ধারের জন্য।’

তিনি বলেন- ‘কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আমাকে অনেক স্নেহ করেন। নেত্রীও (শেখ হাসিনা) জানেন আমার স্বচ্ছতার কথা, আমি নীতি বিবর্জিত কোনো কাজে নেই। নেত্রী প্রায়ই বলেন যার যার অবস্থান তৈরি করতে হবে এবং জনমত যার পক্ষে আমি তাকেই মনোনয়ন দেবো। নেত্রীর এ বক্তব্যে আমি আশাবাদি।’

মতপার্থক্য নিয়ে আসাদ বলেন- ‘আমি মনে করি একটা গণতান্ত্রিক দলে মনোনয়ন চাওয়ার অধিকার সবার আছে। যেহেতু কামরান ভাইকে আমরা একবার পৌরসভার চেয়ারম্যান এবং দুই বার মেয়র নির্বাচিত করেছি। তৃতীয়বার মানুষ চলে গেছে পরিবর্তনের পক্ষে। আর বর্তমান বাস্তবতাও নতুনত্বের পক্ষে।’

নতুন কেউ ছাড়া এ মেয়র পদ পুনরুদ্ধার কঠিন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে দুজনের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই এবং সম্পর্কের অবনতি ঘটারও সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি দল যাকে মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই কাজ করার কথা জানান।

সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৩ সালের ১৫ জুন। আগামী ৩০ জুলাই ভোট গ্রহণের তারিখ ঠিক করে সিলেট সহ দেশের ৩ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের তফসীল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ওই নির্বাচনে মেয়র পদকে টার্গেট করে এখন থেকেই তৎপরতা চালাচ্ছেন আসাদ-কামরান।

এর আগে বুধবার (১৩ জুন) দুপুরে সিলেটসহ রাজশাহী ও বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক তফসীল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তফসীল অনুযায়ী বুধবার (১৩ জুন) থেকে এই তিন সিটি নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও জমা দেওয়ার দিন শুরু হয়েছে।

ঘোষিত তফসীল অনুযায়ী তিন সিটির মেয়র, সংরক্ষিত আসন ও সাধারণ আসনের কাউন্সিলরদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ২৮ জুন। রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছ মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। রিটার্নিং অফিসার ১ থেকে ২ জুলাই মনোনয়নপত্র বাছাই করবেন। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ৯ জুলাই।

রাজনীতি যেখানে আছে সেখানে বিপত্তিও আছে। তবে এসব বিপত্তির মাঝেও রাজনীতিতে শেষ বলে কোনো কথা নেই। এখন কার পায়ে বল আর কার জালে বল, নগরবাসী এখন তাই দেখার অপেক্ষায়।