ক্রসফায়ার নয়, আগে জানুন মাদক বিস্তারের কারণ

মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী চলমান পুলিশী অভিযান, ঘটা করে রেইড এবং সেখান থেকে বেছে বেছে ক্রসফায়ারে দেয়া, এসব দিয়ে দেশের শিরায়-উপশিরায় প্রোথিত মাদক সমস্যার কোন টেকসই সমাধান হবে না। অভিযান চলাকালে বড়জোর ৫০% সরবরাহ কমবে, তারপরও চাহিদা যখন আছে, তখন প্রয়োজনে শরীরের ভিতরে অপারেশন করে প্যাকেট ঢুকিয়ে হলেও এর চালান সীমান্ত এলাকা থেকে নিয়ে আসা হবে। গরীব মানুষেরা, অর্থের টানে মাদক এর সম্রাট, জমিদার, তালুকদারদের ক্রীড়নক হয়ে, বাহক হিসেবে খেটে যাবে পেটের দায়ে।

মাদকের পাচার স্থায়ীভাবে বহুলাংশে কমাতে হলে আরো কয়েক জায়গায় হাত দিতে হবে। আরো কম্প্যাশনেটলি কাজ করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে টি-টুয়েন্টি টাইপের যুদ্ধ নয়, শুরু করতে হবে এক দীর্ঘমেয়াদী ঠান্ডা মাথার টেস্ট ম্যাচ।

মাদক এদেশের অন্যতম প্রধান সামাজিক সমস্যা। কোটি কোটি মানুষ মাদকে আসক্ত। আমার কৈশোরে দেখেছি কিভাবে প্যাথেড্রিন ইঞ্জেকশন নিয়ে রক্তাক্ত বাহু চেপে ধরে ছটফট করে ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে শুয়ে থাকতো আশেপাশের কিছু বন্ধুরা। প্রথম যৌবনে দেখেছি ম্যান্ড্রেক্স এর সিডেশনে ঘুম ঘুম চোখে ছেলেমেয়েরা লতার মত জড়িয়ে ধরে তালে তালে পা ফেলে বিড়বিড় করে গাইছে ‘অল ইন অল ইটস জাস্ট এনাদার ব্রিক ইন দ্য ওয়াল’, দুয়েকটা ছেলে ওয়ালেট থেকে বের করছে প্যাকেটে মোড়ানো ছোট্ট পুরিয়া, পাক-আফগান মুল্লুক থেকে নাকি এসেছে। সিগারেটের প্যাকেটের সোনালি রাংতায় আঠালো গোল্লাটা রেখে নিচ থেকে আগুনের তাপ দিয়ে তাতাচ্ছে। নতুন জিনিস ‘হ্যাশিস’!

বেশিদিন যায় নি, তাদের হাতেই উঠে এলো পাউডারের মতো কি এক নতুন পদার্থ, ব্রাউন সুগার! ২-৪ বছরের মধ্যেই যার নাম হয়ে উঠলো হেরোইন। ৮০’র দশকের শুরুতে কেবল দেখতাম বড়লোকের বখে যাওয়া ছেলে এবং কিছু মেয়েদের মধ্যে এই নেশা। বেশিদিন লাগে নি। এদের সাথে থাকা মধ্য-নিম্ন বিত্তের লোকেরা, যারা এনে দিত, ধরিয়ে দিত, ফুট ফরমাইশ খাটতো, তাদের মাঝেও দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়লো মাদকের বিষাক্ত ছোবল।

১০ বছরের মধ্যে, ৯০ দশকের শুরুতেই মাদক এর ডালপালা ছড়িয়ে পরলো দেশের সর্বত্র। আজ ৪০ বছরের মাথায় বাংলাদেশের কমপক্ষে ২ কোটি মানুষ ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন সহ নানা মাদকে আসক্ত। মাদক ব্যবসা এদেশের নাম্বার ওয়ান ব্যবসা। ২ কোটি লোক মাসে কমপক্ষে ১ হাজার টাকার মাদক সেবন করলেও, বছরে আড়াই লক্ষ কোটি টাকার মাদক এদের কাছে বিক্রি করা হয়। যা বার্ষিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের গার্মেন্টস সেক্টরের চেয়েও আকারে বড়!

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক, ড্রাইভার, এমনকি পথ শিশুর মধ্যেও ঢুকে গেছে মাদকের সর্বনাশা বিষ। মাদকের কারণে সন্তানের হাতে বাবা খুন হচ্ছে, স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন হচ্ছে, ভাই এর হাতে বোন খুন হচ্ছে, এমনকি বাবার হাতে সন্তান খুন হচ্ছে! ঘরে ঘরে নিগৃহীত হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন। পথের শিশুরাও আজ পলিথিনের ব্যাগের ভিতর কি এক কেমিক্যাল ভরে তার গন্ধ শুকে হাতে খড়ি নিচ্ছে মাদক সেবনের।

মাদকের কারণে লক্ষ লক্ষ যুবক লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছে, কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়েছে। চুরি-ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরন শত শত গুনে বেড়ে গিয়েছে কেবল মাত্র এই মাদকের কারণে, মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে। ধর্ষণ, দুর্নীতি, খাদ্যে ভেজাল, নির্মাণ কাজে নিম্নমান- সব কিছুর পিছনে মাদকের এক বড় অবদান। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, শিক্ষার মান কমেছে, অপরাধ বেড়েছে, স্বাস্থ্যহানী, জীবনের সার্বিক মান কমেছে এই মাদকের কারণে। এই জাতির ১০ থেকে ৬০ বছর বয়সী এক বিশাল জনগোষ্ঠী আজ অসুস্থ।

এত বিশাল জনগোষ্ঠী মাদকে আসক্ত হওয়ার পিছনে কি কি কারণ থাকতে পারে? প্রথম কারণ হতাশা। লেখাপড়ায়, প্রেমে, ক্যারিয়ারে, সংসারের অশান্তি সহ নানা কারণে মানুষ হতাশাগ্রস্থ হয় এবং হতাশা কাটাতে কাউকে না পেয়ে, কোন কাউন্সেলিং এর ব্যবস্থা না থাকায়, কারো দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ না থাকায়, সে মাদকের আশ্রয়ে যায়।

এর পরে আছে পেয়ার প্রেশার; বন্ধু বা আশেপাশের সঙ্গী-সাথীর সাহচর্যের কারণে। একজন যার কোন হতাশা নেই, সমস্যা নেই, সেও সঙ্গী-সাথীর কারণে মাদকে প্রবেশ করতে পারে। বন্ধুদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য, বন্ধুদের থেকে পিছিয়ে না পড়ার জন্য, স্রেফ মজার করা জন্য, একটা বার ট্রাই করতে যেয়ে এরা সর্বগ্রাসী মাদকে ঢুকে পড়ে। পরে আর বের হতে পারে না।

এর পাশাপাশি আরো আছে নির্মল চিত্ত বিনোদনের অভাব; যার কথা সহজে কেউ মুখ ফুটে বলে না। কৈশোর এবং প্রথম যৌবনের প্রধান ধর্মই হচ্ছে আনন্দ-ফুর্তি করা। হই-চই এ মেতে ওঠা মাঝে মাঝে। এই সময়ে দলবেঁধে ঘুরতে যেতে মন চায়, চায় গান বাজনা, পার্টি-মজলিশ এর মজমায় মাঝে মাঝেই ডুব দিতে। আনন্দ-ফুর্তির অনাদিকালের অনুসংগ হচ্ছে কিঞ্চিত পানাহার। সারা বিশ্বে স্বীকৃত এবং সমাদৃত সীমিত মাত্রার পানীয় এই ভন্ড মোনাফেকের দেশে নিষিদ্ধ। ভন্ডেরা ফাইভ স্টার হোটেলে ১% লোকের চিত্ত বিনোদনের সুযোগ রেখেছে, কিন্তু ৯৯% আনএফোর্ডেবল মানুষের জন্য কিচ্ছু ব্যবস্থা রাখে নি। ফলাফল এই সর্বনাশা মাদকের বিস্তার।

২০০০ সনে ১ সপ্তাহের জন্য জাকার্তায় এক ট্রেনিং কাম রিট্রিট এ গিয়েছিলাম। ১০-১৫ জন স্থানীয় ছেলে-মেয়ের সেই ক্যাম্পিং এ খাবার টেবিলে কোক-পেপসির পাশে থরে থরে সাজানো থাকতো খোদ ইন্দোনেশিয়ায় তৈরি স্টাউট এর ক্যান (আহা!)। দুপুরে যোহরের আজানের শব্দে মেয়েগুলো ঝটপট শর্টস এর উপর চাপিয়ে নিত আলখেল্লা। ইয়াচ্চুক ইমামতি করতো আর প্রিয় ইয়াসমিনা আর বাকীরা আমাদের ডান দিকে একই কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতো। আর এদেশে? ত্যানা প্যাচানো আর ভন্ডামি কত প্রকার আর কি কি তার ১০০০টা উদাহরন তৈরি করছি প্রতিদিন।

সারা বিশ্বে যা স্বাভাবিক, এদেশে তা নিষিদ্ধ! সারা দুনিয়াতে যা ডাল-ভাত, এদেশে তা আস্তাগফিরুল্লাহ! এমনকি দুবাই, মালয়েশিয়া, তুরস্ক সহ প্রায় গোটা মুসলিম বিশ্বে যা হাতের নাগালে, প্রকাশ্যে, বাংলাদেশে তা চোখের আড়ালে। সামান্য একটা বিয়ারের ক্যান যোগাড় করতে এদেশে ১০০ মাইল পাড়ি দিতে হয়, এক বোতল এলকোহল এর পানীয় পেতে সাত মন ঘি ঢালতে হয়! সে দেশে মানুষ বিয়ার না পেলে হাতের কাছে সস্তায় ফান্টু/ফেনসিডিল পেলে সেটাই তো খাবে! আপনি আর আপনার ছেলেমেয়েরা উৎসবে রঙ্গীন পানীয় খাবেন আর পয়সা কম যাদের, তারা এবং তাদের ছেলেমেয়েরা ইসপগুলের সরবত খেয়ে ফুর্তি করবে- এমন ভন্ডামি, মোনাফেকি আর কতদিন? এদেশে উপর মহলের ঘরে রঙ্গীন পানীয়ের বোতল সাজানো থাকে, আর মাঠে গিয়ে সুরেশ-জয়নুদ্দিনেরা এক-দো-চোয়ানী গলায় ঢালতে গেলে তাদের কোমরে দড়ির টান পড়ে!

উপরের যে কারণগুলো বলেছি, সেদিকে হাত দেন। প্রথমেই কি কি না পেয়ে মানুষ মাদকাসক্ত হয় সেটা নিবারণ করুন। যেসব সেবা এবং সুযোগ-সুবিধা থাকলে মানুষ মাদকে না গিয়ে সুস্থ পথে হাঁটবে, সেই কাজগুলো করুন। মাদকের উৎস বন্ধের পাশাপাশি রিহ্যাব, কাউন্সেলিং এবং বিনোদনের ব্যবস্থা করুন। কি কি উদ্যোগ নিলে মাদক এর বিস্তার কমবে, সেটা চিহ্নিত করে বাস্তবায়ন করুন।

দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল দেখতে চাইলে পাঁচ-ছয়টা মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করে ৫-১০ বছর মেয়াদী ফুল-প্রুফ প্ল্যান করেন। কম্প্যাশনেট, বুঝদার, শিক্ষিত লোকদের দায়িত্ব দিন। এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য যেমন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সেল আছে, মাদক কমাতেও একটা কান্ট্রি প্ল্যান করে সেটা বাস্তবায়ন এর জন্য তেজগাঁও অফিসে একটা দক্ষ এবং শক্তিশালী সেল গঠন করুন। একটা কান্ট্রি প্ল্যান নিয়ে এগোন। এখনই! বেটার লেইট দ্যান নেভার …।

লেখক : কৃষি ও পর্যটন উদ্যোক্তা