কুশিয়ারার ভাঙনে অর্ধশত পরিবার খোলা আকাশের নিচে

ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল হক

বালাগঞ্জ উপজেলার পূর্ব গৌরীপুর ইউনিয়নে কুশিয়ারা নদীর ভয়াবহ ভাঙনের মুখে প্রায় অর্ধশত পরিবার খোলা আকাশের নিচে। এরমধ্যে বর্তমানে গৃহহারা হয়ে পড়েছে স্থানীয় সাদেকপুর গ্রামের কমপক্ষে ১০টি পরিবার। আরো অন্তত ৩০টি পরিবার আংশিক ভাঙনের শিকার হয়েছে। এ অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের মধ্যে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে- গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার (১৩ এপ্রিল) পর্যন্ত অর্ধ শতাধিক পরিবার এ সর্বগ্রাসী ভাঙনের মুখে পড়েছে। ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা এবং আতঙ্ক বিরাজ করছে। এসব পরিবারের নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ পরিবারের লোকজন মারাত্মক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন। তারা বসবাস করছেন খোলা আকাশের নিচে।

অন্যদিকে আশপাশ এলাকার ঘর-বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের লোকজন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তাদের সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করেছেন।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক দিন যাবত কুশিয়ারা নদী তীরবর্তী সাদেকপুর গ্রামে নদী ভাঙনের আশঙ্কা বিরাজ করছিল। গত মঙ্গলবার বিকাল থেকে পরিস্থিতি বিপদজনক আকার ধারণ করে। সর্বশেষ সন্ধ্যা এবং মধ্যরাতে কয়েক দফায় এসব বাড়ির বসতভিটা নদীতে ধ্বসে পড়ে। গ্রামের মনোরঞ্জন সূত্রধর, রণজিত সূত্রধর, নিপেন্দ্র সূত্রধর, কল্পনা সূত্রধর, চরিত্র সূত্রধর, মজনু মিয়া, সালেহ আহমদ, আইয়ুব আলী, লিয়াকত আলী এবং আনোয়ারা বেগমদের ১০টি পরিবার গৃহহারা বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বসতভিটার পাশাপাশি প্রচুরসংখ্যক গাছগাছালি এমনকি মুসলিম কবরস্থান পর্যন্ত নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা আসেফ আয়নান বখশ জানিয়েছেন- কমপক্ষে সাড়ে ৪শ মিটার এলাকা ভাঙনের শিকার হয়েছে। পূর্ব গৌরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিমাংশু রঞ্জন দাস, ইউপি সদস্য নূরুল ইসলাম পুতুলসহ এলাকাবাসী জানিয়েছেন, স্থানীয় এলাইছ মিয়া, চেরাগ আলী, চমক আলী, মিনার মিয়া, আকতার আলী, জহির আলী, সুশেন্দ্র সূত্রধর, রশেন্দ্র সূত্রধর, মণিন্দ্র সূত্রধর, অমর সূত্রধর, বাদল সূত্রধর, রিপন সূত্রধর, অর্চনা সূত্রধর, মণি সূত্রধর, মিণ্টু সূত্রধর, সণ্টু সূত্রধর, ফণি সূত্রধর, বীরেন্দ্র সূত্রধর, সুবিনয় সূত্রধর, বেণী সূত্রধর, ললি সূত্রধরসহ প্রায় অর্ধশত পরিবার নদীভাঙ্গনের হুমকীর মধ্যে রয়েছে।

এলাকাবাসী জানান, পূর্ব গৌরীপুর ইউনিয়নের সাদেকপুর, কায়েস্থঘাট, হাঁড়িয়ার গাঁও, বিনোদপুর, আমজুরসহ আশপাশের গ্রামে প্রতি বছর দফায় দফায় নদীভাঙনের শিকার হয়ে শত শত পরিবার ইতোমধ্যে গৃহহারা হয়ে পড়েছে। অসহায় এসব পরিবারের সদস্যরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

আলাপকালে সাদেকপুর গ্রামের গৃহহারা পরিবারের সদস্য চরিত্র সূত্রধর (৮৫), জাহানারা বেগম (৪৫), সালেহ আহমদ (৫৫), রণজিত সূত্রধর (৭৫) বলেন, নদীভাঙনের কবলে আমাদের প্রতিবেশীদের অসংখ্য বসতভিটা, গাছগাছালি বিলীন হয়ে গেছে। এমনকি মুসলিম কবরস্থান, দেবতাঘরও ভূমিধ্বসের শিকার হয়েছে। স্থানীয়ভাবে আরও ভাঙন ও ভূমিধ্বসের আশঙ্কা বিরাজ করছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে জরুরী সহায়তা প্রদান ও নদীভাঙ্গন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তারা সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে বুধবার সকাল ১১টায় বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল হক নদীভাঙন কবলিত সাদেকপুর গ্রাম পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি উদ্ধার তৎপরতা প্রত্যক্ষ করেন ও বসতিহারাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি পরিবারের মধ্যে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে নগদ ২ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

এ সময় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হিমাংশু রঞ্জন দাস, ইউপি সদস্য নূরুল ইসলাম পুতুল, বালাগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কামাল আহমদ, সাংবাদিক মো. জিল্লুর রহমান জিলুসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আসেফ আয়নান বখশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, মারাত্মক নদীভাঙ্গন প্রতিরোধের ব্যাপারে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বালাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবদাল মিয়া বলেন, নদীভাঙ্গনের শিকার পরিবারগুলোকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। সকল প্রকার সহযোগিতা করতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।