এক ‘বিনিময়’ দিয়ে সহজ হবে অনেক কিছু

0
0

মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএসে একটা থেকে অন্যটায় টাকা স্থানান্তর করা যায় না। অথচ বিষয়টা খুবই জরুরি। এই জরুরি বিষয়টা এখন বড় এক সমস্যার নাম। সেই সমস্যার সমাধান হয়ে সহজ হতে যাচ্ছে বিষয়টি। এখন চাইলেই বিকাশ থেকে রকেটে বা রকেটে থেকে বিকাশে টাকা পাঠানো যাবে। শিগগিরই অনুমোদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে নগদেও এই সেবা যুক্ত হবে বলে জানা গেছে।

শুধু তাই নয়, বিকাশ বা বিভিন্ন এমএফএস সেবা থেকে বিভিন্ন ব্যাংকেও টাকা পাঠানো যাবে। যে প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাজটি করা সম্ভব— সেটা হলো বিনিময়। এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এক এমএফএস থেকে অন্যটায় বা ব্যাংকে লেনদেন করা সম্ভব হবে।

আগামী রবিবার (১৩ নভেম্বর) এই প্ল্যাটফর্মটির উদ্বোধন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লু-তে বিনিময়ের উদ্বোধন করবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সুফল বাংলাদেশের জনগণ পেতে শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে আমরা মোবাইল ফাইন্যান্সিংসহ আরও অনেক ডিজিটাল সেবা দেশের মানুষকে উপহার দিতে পারছি, যা সম্ভব হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকন্যা, আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই ডিজিটাল বাংলাদেশের আর্কিটেক্ট, প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় ভাইয়ের প্রতি। যিনি তথ্য-প্রযুক্তিগত উন্নয়নের লক্ষ্যে সুপরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও উদ্ভাবনী জাতি হিসেবে স্মার্ট বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠায় দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। যিনি একই সঙ্গে প্রাইভেট এবং গভর্নমেন্ট সেক্টরকে একত্রিত হয়ে কাজ করার জন্যেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। এরই আলোকে ডিজিটাল এবং স্মার্ট অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে সব ক্ষেত্রে ই-পেমেন্ট ও মোবাইল পেমেন্টের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে আন্তঃবিনিময় যোগ্যতা, কম খরচ, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিনিময় (ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল ট্র্যানজেকশন প্ল্যাটফর্ম-আইডিটিপি) সিস্টেমের বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে আগামী ১৩ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাচ্ছে বিনিময়, যেখানে ধাপে ধাপে যুক্ত হবে সরকারি পরিষেবা বিল, মেট্রোরেলের টিকিট কাটার সুবিধাসহ নানা সেবা।’

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে তৈরি হয়েছে বিনিময়। এই বিষয়ে পলক বলেন, ‘বিভিন্ন পেমেন্ট সার্ভিস অংশ গ্রহণকারীদের যেমন- গ্রাহক, মার্চেন্ট, অর্থ প্রদান ও গ্রহণকারী, ই-ওয়ালেট, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লেনদেনের চমৎকার একটি সেতুবন্ধন তৈরি করবে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সামগ্রিক ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এতে দেশের একটি সুশৃঙ্খল লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি এবং জনসাধারণের ব্যয় সাশ্রয়সহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ব্যাপক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে। বিনিময় কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশ ক্যাশলেস সোসাইটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে যাবে। ফলে অর্থ জালিয়াতি, মানি লন্ডারিং, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নসহ অন্যান্য সব অর্থনৈতিক অপরাধ রোধ সহজতর হবে। এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস-সহ পুরো তথ্য প্রযুক্তি খাতে বড় মাইলফলক অর্জিত হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। সত্যিকার অর্থে আমরা বিনিময়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখছি, যা আমাদের স্মার্ট বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে।’

জানা গেছে, বিনিময় প্ল্যাটফর্ম হলো একটি অ্যাপ। অ্যাপটি বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন অ্যাকাডেমি (আইডিয়া) প্রকল্প এটি তৈরি করেছে। এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৬৫ কোটি টাকা। যদিও এটির জন্য বাজেট ছিল ৫৫ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে খরচ বেড়ে যায়। অ্যাপটি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য রয়েছে ওরিয়ন ইনফরমেটিকস লিমিটেড, মাইক্রোসফট বাংলাদেশ লিমিটেড, ফিনটেক সলিউশন লিমিটেড ও সেইন ভেঞ্চারার্স লিমিটেড।

বিনিময়ের ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন অ্যাকাডেমি (আইডিয়া) প্রকল্পের পরিচালক আলতাফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা ইন্টারঅপারেবল একটি সিস্টেম। এরমাধ্যমে ব্যাংক থেকে এমএফএসে, এমএফএস থেকে ব্যাংকে টাকা পাঠানো যাবে। এই মাধ্যমে টাকা পাঠানোর বিষয়ে যে জটিলতা ছিল সেটা দূর হবে।’ নগদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নগদের জন্য আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকে রেফার করেছি। বাংলাদেশ ব্যাংক যেদিন অনুমোদন দেবে, সেদিন নগদ এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হবে। একইসঙ্গে পর্যায়ক্রমে দেশে যত এমএফএস সেবা আছে, সবই এই নেটওয়ার্কে যুক্ত হবে। নতুন নতুন ফিচারও আসবে।’ তিনি জানান, এই মুহূর্তে বিকাশ, রকেট ও এটুআইয়ের এমএফএস সেবা একপে সেবা বিনিময়ে যুক্ত হবে।

জানা গেছে, বিনিময়ে যুক্ত হচ্ছে না সব ব্যাংক। সোনালী ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, আল–আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংক ও ডাচ–বাংলা ব্যাংক লিমিটেড প্রাথমিকভাবে বিনিময়ে যুক্ত হচ্ছে।

বিনিময় যেভাবে কাজ করবে

বিনিময় ওয়েব বেজড একটি প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্মে বিনিময় একটি সেবা হিসেবে ব্যাংক, এমএফএ’র অ্যাপে যুক্ত হবে। এটি ব্যবহার করতে চাইলে গ্রাহককে প্রথমে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধন সম্পন্ন হলে গ্রাহকের নামের পরে binimoy.gov.bd যুক্ত হয়ে একটি আইডি তৈরি হবে। এরপরে গ্রাহক দুটি অপশন দেখতে পারবেন সেন্ড মানি ও রিসিভ মানি।

কাউকে টাকা পাঠাতে চাইলে সেন্ড মানি অপশনে গিয়ে নিজের যেসব এমএফএস অ্যাকাউন্ট (বিকাশ, রকেট) অ্যাকাউন্ট আছে, তা থেকে একটি বেছে নিতে হবে। যাকে টাকা পাঠানো হবে তার মোবাইল নম্বরে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যদি বিনিময় আইডি থাকে, তাহলে সেই নম্বর দিয়ে টাকা পাঠানো যাবে। যাকে পাঠানো হয়েছে তিনি রিসিভ মানি অপশনে গিয়ে নিজের অ্যাকাউন্টে থাকা যেকোনও এমএফএস আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নম্বরে টাকা গ্রহণ করতে পারবেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বিকাশ থেকে রকেটে টাকা পাঠাতে (প্রতি হাজারে) খরচ হবে ৫ টাকা। আর এমএফএস সেবা (বিকাশ, রকেট ইত্যাদি) থেকে ব্যাংকে টাকা পাঠাতে (প্রতি হাজারে) খরচ হবে ১০ টাকা। অপরদিকে এমএফএস থেকে পেমেন্টে সার্ভিস প্রোভাইডারের (পিএসপি) অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে খরচ হবে হাজারে ৫ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক গত বৃহস্পতিবার (১০ নভেম্বর) এক প্রজ্ঞাপনে এই নির্দেশনা জারি করেছে। এতে আরও জানানো হয়েছে— ইন্টারঅপারেবল ডিজিটাল ট্র্যানজেকশন প্ল্যাটফর্ম-আইডিটিপি রবিবার (১৩ নভেম্বর) চালু হবে এবং সোমবার (১৪ নভেম্বর) থেকে লেনদেন করা যাবে। কোন সেবা পেতে কত খরচ হবে, তা প্রজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।