ঈদের ছুটিতে ঘুরে আসুন গোয়াইনঘাট

দীর্ঘ সময় বন্দী মন খানিকটা ছুটি পেলেই ছটফট করে একটু প্রকৃতিতে যেতে, বিশুদ্ধ আলো-বাতাসের ছোঁয়া পেতে। কর্মব্যস্তময় সময়ে কতদিন বেড়ানো হয় না। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে তাই প্রকৃতির কাছাকাছি যেতেই হবে।

যারা ভাবছেন কোথাও ঘুরতে যাবেন এবারের ঈদের ছুটিতে, তারা ঘুরে আসতে পারেন দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভারত সীমান্তঘেরা অঞ্চল পাথরের রাজ্য সিলেটের গোয়াইনঘাটে। অপার সৌন্দর্যমন্ডিত আর প্রকৃতির সাথে সখ্য- এমন পাঁচটি পর্যটন স্থান নিয়ে প্রস্তুত গোয়াইনঘাট। তাই এবার ঈদে এ সীমান্ত জনপদ আপনার পদচারনায় হয়ে উঠতে পারে আরও মুখর।

অপরূপ দৃশ্যে পর্যটকদের নজর কাড়ে প্রকৃতি কন্যা জাফলং

সিলেট শহর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরত্বে মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসে ৬৫ টাকা ভাড়ায় জাফলং পৌঁছাতে সময় লাগবে দুই ঘন্টা। কিছু দূরেই দেখা যাবে পাহাড়ের কান্না। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অঝরে ঝরছে স্বচ্ছ ঝর্ণাধারা। পূর্ব-দিগন্তের সারি সারি পাহাড়ের বুক চিরে যেতে যেতে একসময় হারিয়ে যেতেও মন চাইবে কল্পনায়। পাশে প্রিয় সঙ্গী থাকলে তো কথাই নেই। যতে পারেন পরিবার-পরিজনের সঙ্গেও। মায়াময় জাফলংয়ের প্রকৃতির সাথে মিশতে গিয়ে মন এতটাই বদলে যাবে, যেন বারবার ঘুরে আসতে চাইবে ফেলে আসা স্মৃতিতে। তারও পূর্বে যেখানে শেষ প্রান্ত, সেখানেই রয়েছে সীমান্ত জনপদ।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ইউনিয়নে ভারত-বাংলাদেশ মেঘালয় পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র এই জাফলং। এখানে রয়েছে জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্মিত জেলা পরিষদ ডাকবাংলো, তামাবিল জিরো পয়েন্ট, পার্বত্য অঞ্চলের মত আঁকাবাঁকা মেঠো পথ, ছোট-বড় পাহাড়-টিলা, জাফলং পিকনিক সেন্টার, জাফলং গ্রীণ পার্ক, সবুজের সমারোহে সমতল চা-বাগান আর সীমান্তের ওপারেই আকাশ ছুঁই ছুঁই করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। সেই পাহাড়ের গায়ে ভেসে বেড়াচ্ছে বর্ষার মেঘমালা। ওই পাহাড়ের গা থেকে ঝরে পড়ছে অবিরাম ঝর্ণাধারা।

জাফলংয়ের পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলধারায় সাদা-কালো রঙ-বেরঙয়ের বিভিন্ন আকৃতির পাথর, নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী খাসিয়া সম্প্রদায়ের ব্যতিক্রমধর্মী বসত ঘর, জিরো পয়েন্টের ওমঘট নদীর উপর ভারতের ঝুলন্ত ব্রীজ, খাসিয়া জনগোষ্ঠির পান চাষ, জাফলংয়ের মানুষের সহজাত বন্ধুতা আনন্দময় করে তুলবে আপনার ভ্রমণকে।

জাফলং জিরো পয়েন্টের অদুরেই দেখা যায় রূপকন্যা খ্যাত মায়াবী ঝর্ণা। পাহাড় থেকে আছড়ে পড়ছে স্বচ্ছ জলরাশির ঝর্ণাধারা। পাহাড়ের বুকে সবুজের সমারোহ আর চারপাশে পানির কলকল ধ্বনি। আছে হরেক রকমের নুঁড়ি পাথর। যেন কেউ বিছিয়ে রেখেছে পাথরের বিছানা। পাথরের উপর পানির কলকলানি আর পাখির কিচির মিচির শব্দে তৈরি হয় এক অনিন্দ্য সুন্দর পরিবেশ। তাই তো স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছেন মায়াবী ঝর্ণা।

দেশ-বিদেশ থেকে আগত ভ্রমন পিপাসুদের শত ক্লান্তি আর বিষাদ ছাপিয়ে নিমিষেই মন ভরে উঠে প্রশান্তিতে। প্রকৃতির এমন কাছাকাছি আসতে পেরে পর্যটকরা মেতে ওঠেন বাঁধ ভাঙ্গা উল্লাসে। ঝর্ণার স্বচ্ছ ও শীতল জলে গা ভিজিয়ে রোমাঞ্চকর অনুভূতি আপনাকে দেবে সীমাহীন আনন্দ।

দেশের একমাত্র মিঠা পানির জলাবন বা সোয়াম্প ফরেস্ট রাতারগুল

গোয়াইনঘাট উপজেলায় ফতেহপুর ইউনিয়নের গোয়াইন নদীর দক্ষিণে এই বনের অবস্থান। বনের দক্ষিণ দিকে আবার রয়েছে দুটি হাওর- শিমুল বিল হাওর ও নেওয়াা বিল হাওর। সিলেট শহর থেকে রাতারগুলের দূরত্ব ২৬ কিলোমিটার। সিলেট-জাফলংয়ের গাড়িতে চড়ে নামতে হবে সারিঘাট। ভাড়া ৪০ টাকা থেকে ৫০ টাকা। সেখান থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় চড়ে গোয়াইনঘাট বাজার। সিলেট শহরের আম্বরখানা থেকেও যাওয়া যায় সরাসরি। অটোরিকশা ভাড়া নেবে জনপ্রতি ৫০-৬০ টাকা। বাজার থেকে নৌকা ভাড়া করে যেতে হবে রাতারগুল।

এখানে রয়েছে বিশাল জলাভূমির মধ্যে কোমর ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি গাছের একটি জঙ্গল। ডালে ডালে ঘুরে বেড়ায় নানা প্রজাতির পাখি ও বিভিন্ন বন্য প্রাণী। ভেতরের দিকে জঙ্গলের গভীরতা এতোটাই বেশি যে সূর্যের আলো গাছের পাতা ভেদ করে জল ছুঁতে পারে না। নৌকায় ঘুরে আপনি পাবেন সীমাহীন আনন্দ। বনের ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখতে পাবেন নানা প্রজাতির পাখি। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মাছরাঙা, বিভিন্ন প্রজাতির বক, ঘুঘু, ফিঙে, বালিহাঁস, গুঁইসাপ, পানকৌড়ি ইত্যাদি। বন্যপ্রাণীর মধ্যে আছে উদবিড়াল, কাঠবিড়ালি, বানর, মেছো বাঘ ইত্যাদি। নানান প্রজাতির সাপেরও অভয়াশ্রম এই বন।

রাতারগুলের সৌন্দর্য বলে শেষ করার নয়। বনের একেবারে শুরুর দিকটায় মুর্তার বন। বর্ষায় বেশির ভাগই ডুবে থাকে এ গাছগুলো। এর পরে মূল বন। বনের যতোই গহীনে যাবেন, গাছের ঘনত্ব ততই বেশি দেখবেন। কোথাও কোথাও যেন সূর্যের আলো পর্যন্ত দেখা যায় না। দু-একদিন বৃষ্টি না হলে বনের জল এত বেশি স্বচ্ছ হয় যে বনের সবুজ প্রতিবিম্বকে মনে হয় পানির নিচে আরেকটি বন।

প্রকৃতির অপ্সরা খ্যাত বিছনাকান্দি

বিছনাকান্দির সৌন্দর্য অসাধারণ। এখানে যাওয়ার পর যে কথাটি সর্বপ্রথম মনে হবে, তা হলো প্রশান্তি। এখানকার প্রশান্তিটুকু নিমিষেই ভুলিয়ে দেবে প্রতিদিনকার শত গ্লানি। প্রকৃতির সৌন্দর্যের কাছে যেন হার মানতেই হবে নাগরিক সভ্যতাকে। দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত শুধু পাথর আর পাহাড়। পাথর পানি পাহাড় আর মেঘ নিয়েই যেন বিছনাকান্দি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় আকাশ আর মেঘের সাথে পাহাড়ের দলগুলো মিশে আছে।

দীর্ঘ সময় জল-পাথরের বিছানায় শুয়ে-বসে ছবি তুলতে তুলতে আর গোসল করতে করতে হয়তো এক সময় নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন। শীতল পানির তলদেশে পাথরের পাশাপাশি নিজের শরীরের লোম পর্যন্ত দেখা যাবে স্পষ্ট। আর এই চরম সত্যটুকু উপলব্ধি করতে হলে আপনাকে চলে যেতে হবে বিছনাকান্দি।

বিছনাকান্দি যেতে হলে সিলেট-জাফলংয়ের গাড়িতে চড়ে নামতে হবে জাফলং। জাফলং ভ্রমন শেষে যেতে হবে গোয়াইনঘাট বাজার। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় চড়ে বিছনাকান্দি। এছাড়াও যাওয়া যাবে সিলেট থেকে সরাসরি। সিএনজি অটোরিকশা যায় নগরীর আম্বরখানা থেকে, ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা। যেতে পারেন অন্য গাড়ি রিজার্ভ করেও।

তাই ঘুরে আসুন গোয়াইনঘাটের এমন অপরূপ জায়গাগুলো। নৈসর্গিক মুগ্ধতা নিয়ে আপনার অপেক্ষায় সিলেট জেলার অন্যতম সুন্দর এই উপজেলাটি।