ইউনাইটেডেই অনড় খালেদা, সরকারের ‘না’

ফাইল ছবি

কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ইউনাইটেড হাসপাতালেই চিকিৎসা নেওয়ার ব্যাপারে অনড় অবস্থানে রয়েছেন। অন্যদিকে, জেল কোড অনুযায়ী সরকারি হাসপাতাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসা সেবা দেওয়ার প্রস্তাবের পর এবার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) তাকে চিকিৎসা নেওয়ার প্রস্তাব দেবে সরকার। সরকারি দল মনে করছে- খালেদা জিয়া একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। খালেদা জিয়া অসুস্থ হলে নিশ্চয়ই চিকিৎসাসেবা পাবেন, তবে তা হতে হবে জেলকোড মেনে।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে সরকার ও বিএনপি যখন ভিন্ন অবস্থানে তখন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে দলীয় প্রধানের ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে বিএনপি। দলটির নেতারা বলছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণে বেগম জিয়ার আপত্তি আছে এবং সেখানকার পরিবেশ নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। সর্বোপরি সরকারের তরফে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার বিষয়ে নিয়ম না থাকার কথা বলা হলেও এ ধরনের নজির বাংলাদেশে আছে বলেও জানান তারা। এছাড়া চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগীর মানসিক অবস্থাকে আমলে নেওয়াটাই প্রথমত জরুরি বলে মনে করেন বিএনপিপন্থী চিকিৎসকরা।

খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য সিএমএইচে নেওয়ার ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজ যে প্রস্তাব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সে প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের প্রভাবশালী এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বেগম জিয়ার চিকিৎসা বিষয়টি এখন পুরোপুরি সরকার ও তার (খালেদা জিয়া) নিজের ওপর নির্ভর করছে। বাইরে থেকে দল ও নেতারা কেবল বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। বেগম জিয়া যদি সিএমএইচে যেতে চান, তাহলে তো দলের কিছু করার নেই।’

এর আগে, মঙ্গলবার (১২ জুন) খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে ভর্তির জন্য তার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দারের আবেদন নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁ কামালের সঙ্গে দেখা করেছিলেন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা বিজন কান্তি সরকারসহ দুই চিকিৎসক। তখন খালেদা জিয়াকে সিএমএইচে চিকিৎসা দেওয়ার প্রস্তাব জানাবেন বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন প্রস্তাব দেওয়ার কথা বললেও বিএনপি নেতারা দলীয় চেয়ারপারসনের ইচ্ছানুযায়ী এখনও ইউনাইটেড হাসপাতালে তার চিকিৎসার ব্যাপারেই মনোভাব দেখাচ্ছেন। এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘ম্যাডামকে হাসপাতালে না নিয়ে সরকার একগুঁয়েমি করছে। অতীতে শেখ হাসিনাও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে গেছেন। কিন্তু, সরকার এখন ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) বিষয়টি অনুমোদন করছে না, এটা গোয়ার্তুমি। তাকে কৌশলে আরও অসুস্থ ও বিপদগ্রস্ত করা হচ্ছে আইনের নামে। অসৎ উদ্দেশ্যে এটা করছে সরকার। এ কারণে তার মৃত্যুও হতে পারে।’

দুদু মনে করেন, খালেদা জিয়াকে তার চাহিদামতো চিকিৎসা না করালে আন্দোলনের প্রশ্ন জোরালো হয়ে আসবে। তার মন্তব্য, ‘ আইন যখন কাজ করে না, তখন শিষ্টাচারের প্রশ্ন মিথ্যে।’

বিএনপি নেতারা বলছেন, ‘সম্প্রতি খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে এবং তার সুচিকিৎসার জন্য ইউনাইটেড হাসপাতালই সর্বোত্তম। আর ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির চেয়ারপারসন বেসরকারি হাসপাতালটিতে যাওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন।

এদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে তিনি ও তার দল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে বলে দাবি করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা। তারা জানিয়েছেন, খালেদার যেসব শারীরিক সমস্যার কথা বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে চিকিৎসার জন্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) রয়েছে। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করার জন্যে মূলত বিএনপি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্যে গোঁ ধরে বসে আছে।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, খালেদা জিয়া একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। ফলে জেলকোড মেনে তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হয় সরকারকে। বিএনপি অন্যায় দাবি করবে আর সরকার তাদের দাবি পূরণ করে ফেলবে সেটাও হয় না। ক্ষমতাসীন দলের নীতি-নির্ধারকরা দাবি করেন, খালেদা জিয়া অসুস্থ হলে নিশ্চয়ই চিকিৎসাসেবা পাবেন, তবে তা হতে হবে জেলকোড মেনে।

এর আগে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে পারিবারিক খরচে তার পছন্দের ইউনাইটেড হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছেন তার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার।

মঙ্গলবার (১২ জুন) দুপুরে খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা বিজন কান্তি সরকার এই আবেদন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে পৌঁছে দেন। তবে ভাইয়ের এ আবেদনকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। তিনি খালেদা জিয়াকে সিএমএইচ হাসপাতালে নেয়ার প্রস্তাব দেন।

তবে পরবর্তীতে নিজের অনড় অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, তারা চাইলে খালেদার চিকিৎসার ব্যবস্থা সরকার সিএমএইচে করতে পারে। এর মধ্য দিয়ে সরকারে অবস্থান খানিকটা নড়চড় হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইউনাইটেড হাসপাতালে খালেদার চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হবে কী না জানতে চাইলে সরকারের দুই জন মন্ত্রী বলেন, বিএনপি যেখানে চাইবে সরকার সুযোগ দিয়ে দেবে তা হবে না। ওই দুই মন্ত্রী বলেন, এটা বিএনপির রাজনৈতিক খেলা। খালেদার চিকিৎসাকে ইস্যু করে তারা ফায়দা লুটে নিতে চায়। এ ই খেলার পার্ট সরকার কেন হবে?

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, খালেদা জিয়া ও তার দল চিকিৎসাকে কেন্দ্র করে গোঁ ধরে বসে থাকার একমাত্র কারণ রাজনৈতিক ফায়দা লুটে নেওয়া। রাজনৈতিক নেতাদের বিএসএমএমইউতেই চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। এই হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররাই সেবা দেন।

আবদুর রাজ্জাক বলেন, এই হাসপাতালের ডাক্তাররাই নামিদামি প্রাইভেট হাসপাতালেও চিকিৎসা দেন। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল দেশের প্রধান হাসপাতাল। এখানে চিকিৎসা না নেওয়ার মানে কী সেটাও ভালো করে খুঁজে বের করা উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিএমএইচে খালেদাকে চিকিৎসা দেওয়ার প্রস্তাব বিএনপি নিশ্চয়ই আপত্তি করবে না বলে মনে করেন আবদুর রাজ্জাক।

সূত্র : বাংলাট্রিবিউন