আমি কি শুধুই কন্যা সন্তান?

আমি এই সমাজের নারীকুলেরই একজন। আমার বাবা মায়ের ৩ সন্তানের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। দুই ভাইয়ের আমিই একমাত্র বোন। একমাত্র মেয়ে হবার কারণে হয়তো আমার পরিবারে কখনও আমাকে আমার ভাইদের থেকে আলাদা করে দেখে নি। কিংবা সমাজের অন্যান্য পরিবারের চাইতে আমার পরিবার অনেক সচেতন ও স্বাধীনমনা।

ছোট বেলা থেকেই গ্রামে বেড়ে ওঠা। গ্রামের আর পাঁচটি মেয়ের চাইতে পড়াশুনা, খেলাধুলা আর সংস্কৃতি চর্চায় পরিবারের সমর্থন পেতাম সব সময়। এক কথায় সর্বোচ্চ স্বাধীনতা ভোগ করছি। মাধ্যমিক থেকে স্কাউটিং আর খেলাধুলার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আমার স্বপ্ন, একদিন আমি দেশের জন্য কাজ করবো, মানব কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দেবো। সেই শিক্ষা আর অনুপ্রেরণা পেয়েছি আমার পরিবারের কাছ থেকে। জীবনের প্রতিটি স্তরে বাবা, মা আর ভাইদের পাশে পেয়েছি তাই প্রতিটি কাজই খুব সহজে করতে পেরেছি।

কিন্তু এটা পুরো সমাজ ব্যবস্থার চিত্র নয়। আমাদের সমাজের চিত্রটা ঠিক এর বিপরীত। আমার এই সুখের জীবনের বিপরীতেও আছে হাজারো স্বপ্ন ভঙ্গের করুণ কাহিনী।

এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হই জেলা সদরের একটি নামকরা কলেজে। সেখানেই বন্ধুত্ব হয় শুভ্রা আর লাবণীর সাথে। প্রিয়া, রুপসা আর তানিয়াসহ আমাদের ছয় বান্ধবীর একটি দল। খুব ভালোই দিন কাটছিলো। প্রতিদিন কলেজে আসা, ক্লাস, প্রাইভেট পড়া আর ছুটির পর একসাথে মজা করতে করতে বাড়ী ফেরা ছিলো আমাদের প্রতিদিনের রুটিন।

একদিন লাবণী আসেনি কলেজে। ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলাম আমরা; হয়তো কোনো কারণে আসতে পারেনি। কিন্তু ৩/৪ দিন কেটে গেলেও লাবণী আসেনি কলেজে। কোনো খোঁজও পাওয়া যাচ্ছিলোনা। একদিন হঠাৎ করেই শুভ্রাদের বাড়িতে এসে উপস্থিত হয় লাবণী। আলুথালু চেহারা আর মলিন মুখ। এসেই শুভ্রাকে জড়িয়ে ধরে সে কি কান্না! কি হয়েছে জানতে চাইলে কান্না জড়ানো কন্ঠে যা বললো তাতে আমরা বজ্রাহত। ওর বাবা একজন ব্যবসায়ীর সাথে ওর বিয়ে ঠিক করেছে, তাও ওই লোক তার পরিবারকে না জানিয়েই বিয়ে করবে ওকে, আর আলাদা বাসা ভাড়া করে থাকবে। ভালো পাত্র হাতছাড়া করার লোভ সামলাতে পারছেন না লাবণীর বাবা মা। যত শীঘ্র সম্ভব ভালো পাত্রের কাছে পাত্রস্থ করতে চান তাঁরা। কিন্ত লাবণীর স্বপ্ন ডাক্তার হওয়ার। আরো লেখাপড়া করার। তাঁদের অব্যাহত চাপে ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় লাবণী; কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনা। সেদিন রাতেই বিয়ে দিয়ে দেন তার। আটকাতে পারিনি আমরা। আমাদের মতামত দুরের কথা যার বিয়ে সেই লাবণীর কথাও শোনার প্রয়োজন মনে করেনি তার পরিবার।

প্রায় এক সপ্তাহ পর কলেজে আসে লাবণী। হাতে সোনার চুড়ি, নাকে নাকফুল আর হাত রাঙা মেহেদির রঙে। সব মেয়েরই স্বপ্ন থাকে এমন সাজের, কিন্তু এভাবে নয়। সেদিনের মেহেদি রাঙা হাত আজ ফ্যাকাশে, যে চোখে স্বপ্ন ছিলো; আজ তা বিবর্ণ। অল্প বয়সে সংসারী হওয়া সেই সংসারও টেকেনি লাবণীর।

সেদিন লাবণীর সেই বিয়ে আমরা আটকাতে পারিনি, কারণ আমরা মেয়ে। লাবণী ছিলো তার পরিবারে শুধুই একটি মেয়ে, যাকে ভালো পাত্রে হস্তান্তর করা তার পরিবারের একমাত্র লক্ষ্য। মাঝে মাঝে ভয় হয়, আমি কি শুধুই কন্যাসন্তান? আমিও কি বেড়ে উঠছি শুধুই ভালো পাত্রে পাত্রস্থ হওয়ার জন্য।

আজ আমরা নারী ক্ষমতায়নে বিশ্বে রোল মডেল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, আমাদের বিরোধীদলীয় নেত্রী একজন নারী, জাতীয় সংসদের স্পিকার তিনিও একজন নারী, তারা সবাই নিজ নিজ স্বপ্নের অবস্থানে পৌঁছে গেছেন।

তবু সামাজিক অসেচতনতায় প্রতিদিন হাজারো নারীর স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটছে। কারণ তারা শুধুই কন্যা সন্তান।