আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবসে পানির ন্যায্য হিস্যা দাবি

আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস উপলক্ষে সিলেটে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার ও কথাকলি, সিলেটের উদ্যোগে “অভিন্ন নদী, অভিন্ন সংস্কৃতি” শীর্ষক সাংস্কৃতিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সুরমা-বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক সংগঠকেরা নদীরক্ষার সংগ্রামে সংহতি প্রকাশ করেন।

সিলেটের কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের মুক্ত মঞ্চে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরার সাংস্কৃতিক সংঘটকরা অংশ নেন। বাংলাদেশ এনভায়রমেন্ট নেটওয়ার্কের যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সংগঠক রানা ফেরদৌসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সাংস্কৃতিক সমাবেশের মূল বক্তব্য রাখেন সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সিলেট শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ভারতের আসাম রাজ্য থেকে আসা সাংস্কৃতিক সংগঠক সুব্রত রায়, অলক পাল চৌধুরী ও ড. রাজিব কর, সম্মিলিত নাট্য পরিষদের সহ-সভাপতি আফজাল হোসেন, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এনামুল মুনির, সারী বাঁচাও আন্দোলনের আব্দুল হাই আল হাদি, বাপার সংগঠক ডা. তায়েফ আহমদ চৌধুরী প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কথাকলি সিলেটের শামসুল বাসিত শেরো।

মূল বক্তব্যে আব্দুল করিম কিম আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবসের প্রেক্ষাপট ও “অভিন্ন নদী, অভিন্ন সংস্কৃতি” শীর্ষক সাংস্কৃতিক সমাবেশের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস নদীর প্রতি জবাবদিহি করার দিন। দিবসটি মানুষকে নদী সম্পর্কে জানায়। প্রতি বছর নানা আয়োজনে বিশ্বের দেশে দেশে এই দিনে নদীরক্ষায় নতুন করে শপথ নেয় মানুষ। নদীর সাথে সংগঠিত অন্যায়ের প্রতিবাদ হয়। বাঁধ বা ব্যারেজ দিয়ে নদীর স্বাভাবিক চলাচল বন্ধের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীরা নিরন্তর আন্দোলন করছেন। তাঁদের এ সংগ্রামের সহযোগী শক্তি সংস্কৃতিকর্মীরা। অভিন্ন নদী, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বরাক-সুরমা পাড়ের মানুষদের সৌহার্দ্যে নদীর পানির অধিকার নিয়ে যেন সৌহার্দ্য বিনষ্ট না হয়, সে লক্ষ্যে সাংস্কৃতিক সংগঠকদের ঐক্যমত গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা-কুশিয়ারার উজানে টিপাইমুখ বাঁধের নির্মাণ সম্ভাবনায় এ অঞ্চলের এক কোটি মানুষের মনে ভীতি আছে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে প্রায় ৫৪টি অভিন্ন নদী আছে। এর মধ্যে ২১টি নদী বরাক-সুরমা অববাহিকা দিয়েই প্রবাহিত। সুরমা, কুশিয়ারা, লোভা, পিয়াইন, ডাউকি, সারি-গোয়াইন, ধলা, সোমেশ্বরী, ধামালিয়া, নয়াগাঙ, উমিয়াম, যাদুকাটা, সোনাই-বারদল, জুরি, মনু, ধলাই, লংলা, খোয়াই, করঙ্গি, সুতাং, সোনাই এই আন্তঃদেশীয় নদীগুলোর উজানে ভারত একতরফা ভাবে একের পর এক বাঁধ ও ব্যারেজ নির্মাণ করছে। সুরমা পাড়ের এক কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক সংগঠকদের জোরালো প্রতিবাদ প্রয়োজন।

ভারতের শিলচরের সাংস্কৃতিক সংগঠক সুব্রত রায় বলেন, বরাক নদীতে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা অন্যায় অন্যায্য। রাষ্ট্রের কাঁটা তার বরাক-সুরমা পাড়ের মানুষের ভাষা ও সাংস্কৃতিক অভিন্নতাকে পৃথক করতে পারেনি। বাঁধ দিয়ে ভাটির দেশের নদ-নদীকে ক্ষতিগ্রস্ত করার যে কোন আগ্রাসী চিন্তায় ভারতের সাংস্কৃতিকর্মীরা লড়বেন।

শিলচরের প্রবীণ সাংস্কৃতিক সংগঠক অলক পাল চৌধুরী বলেন, ভাষায়-গানে-কবিতায়-নাটকে-আনন্দে-ভালোবাসায়-কান্নায় নদীপাড়ের মানুষ অভিন্ন। উজানের নদীতে আন্তর্জাতিক রীতি নীতির লংঘন করে ভাটির মানুষকে বঞ্চনা দেয়ার চেষ্টায় আমরা প্রতিবাদ জানাই।

সভাপতির বক্তব্যে রানা ফেরদৌস বলেন, ভারতের বরাক নদীর দুই শাখা সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা-কুশিয়ারা। বরাক-সুরমা অববাহিকার মানুষের অভিন্ন ভাষা, অভিন্ন সংস্কৃতি। এ অঞ্চলের নদী ও নদীর জলধারা মানুষের মনে সুর ও ছন্দ জাগায়। একই আকাশ, একই বাতাস এক হৃদয়ের একই তো শ্বাস তবুও নদীর ব্যবহার নিয়ে দুই বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে কিছু মন কষাকষি।

সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হওয়া এ ঘন্টাব্যাপী এ সাংস্কৃতিক সমাবেশের শুরুতে নদী নিয়ে কবিতা আবৃত্তি করেন ফাতেমা রশিদ সাবা।

উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে ব্রাজিলে কুরিতিবা শহরে এক সমাবেশ থেকে নদীর প্রতি দায়বদ্ধতা মনে করিয়ে দেওয়ার লক্ষে এ আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। সেই সমাবেশে একত্র হয়েছিলেন বিভিন্ন দেশে বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। তাইওয়ান, ব্রাজিল, চিলি, লেসোথো, আর্জেন্টিনা, থাইল্যান্ড, রাশিয়া, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঐ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা ১৪ মার্চকে আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশে নদীকৃত্য দিবস উদযাপন শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে। সিলেটে ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এই দিবস নিয়মিতভাবে উদযাপন করে যাচ্ছে ।

আন্তর্জাতিক নদীকৃত্য দিবস-২০১৮ উপলক্ষে সিলেট বিভাগে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)-এর পক্ষ থেকে সিলেট বিভাগের চার জেলা সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে একাধিক কর্মসূচী পালন করা হয়েছে । এছাড়া ঢাকা’সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করেছে।

বাপা ও সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার-এর আয়োজনে আজ ১৫ই মার্চ বিকাল ৩ ঘটিকায় “হাওর অঞ্চলের নদ-নদীর নাব্যতা ফেরানো ও বাঁধের কাজে দুর্নীতি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে” সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুরে যাদুকাটা নদী তীরে গণ-অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। এছাড়া যাদুকাটা নদী তীরে রাতব্যাপী অনুষ্ঠিত হবে রিভার ক্যাম্পিং। আগামী ১৬ মার্চ বিকাল ৩টায় সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার দামড়ি বাজারে সারী বাঁচাও আন্দোলন ও সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার ক্ষ্যাপা নদীর তীরে ‘নদী জাগরণ সমাবেশ’ এর আয়োজন করবে।