আজমিরীগঞ্জে চেয়ারম্যান প্রার্থী খুনের আসামীসহ ৬ জন

উপজেলা চেয়ারম্যান আতর আলী মিয়ার মৃত্যুতে শূন্য হওয়া আজমিরীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপ নির্বাচনে মরহুম আতর আলী মিয়ার বড় ছেলে আল-আমিন হত্যা মামলার প্রধান আসামী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিসবাহ উদ্দিন ভূইয়াসহ ৬ প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

গত বুধবার মিসবাহ উদ্দিন ভূইয়ার পক্ষে তার এক আত্মীয় নির্বাচন অফিস থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।

এছারাও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন, মরহুম আতর আলী মিয়ার ছোট ছেলে আলাউদ্দিন মিয়া, ভাতিজা স্বাধীন মিয়া, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মর্তুজা হাসান, সিলেট মহানগর বিএনপি’র সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক খালেদুর রশীদ ঝলক ও জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফেডারেশনের নেতা অ্যাডভোকেট সাইদুল আমিন চৌধুরী শিরুল।

আজমিরীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে উপ নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও বানিয়াচং উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. মোরশেদ আলম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য ৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। আজ ২৪ জুন মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। ২৬ জুন মনোনয়নপত্র বাছাই ও ৩ জুলাই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ। প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র অনলাইনে জমা দিতে পারবেন।

তিনি আরো বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য আমরা সকল ধরণের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ইতোমধ্যে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগের জন্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করছি। আশা করি শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মিসবাহ উদ্দিন ভূইয়া ও মর্তুজা হাসানের নাম প্রেরণ করা হয়েছে। মনোনয়ন বোর্ড আজ-কালের মধ্যে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে। তবে জানা গেছে, দলীয় মনোনয়নের দৌড়ে এগিয়ে আছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিসবাহ উদ্দিন ভূইয়া।

এদিকে, গত শুক্রবার সদ্যপ্রয়াত উপজেলা চেয়ারম্যান আতর আলী মিয়ার বাড়ির সামনে ১ নং সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন পরামর্শ সভা করেছেন। এতে সভাপতিত্ব করেন হাজী মোতাব্বির হোসেন। সভায় বক্তব্য দেন, মরহুম আতর আলী মিয়ার ছোট ছেলে আলাউদ্দিন মিয়া, ভাতিজা ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুছ সেন, স্বাধীন মিয়া, শিশু মিয়া, জাহাঙ্গীর আলম, কমিশনার মজিদ মিয়া, সাবেক মেম্বার রওশন আলী, মোহন মিয়া, আসাদ মিয়া, আব্দুল আউয়াল প্রমুখ।

সভায় ইউনিয়নের শতাধিক লোক উপস্থিত ছিলেন। পরামর্শ সভায় বক্তারা বলেন, মরহুম আতর আলীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তার বড় ছেলে আল-আমিন উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে তিনি দলীয় মনোনয়ন চাইতে গিয়েই খুন হলেন। আতর আলী মিয়ার আর মাত্র এক সন্তান আলাউদ্দিন মিয়া রয়েছেন।

কিন্তু দলীয় মনোনয়ন চাইতে গিয়ে ঘাতকদের হাতে তিনিও খুন হতে পারেন বলে বক্তারা আশংকা করেন। এ হিসেবে দলীয় মনোনয়ন না চেয়ে আলাউদ্দিন মিয়াকে ১ নং সদর ইউনিয়নবাসীর পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে অংশ নেয়ার জন্য সমর্থন দেয়া হয় এবং সভায় আলাউদ্দিন মিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি করা হয়। এছাড়াও সভায় আল-আমিন হত্যা মামলার আসামীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়।

মরহুম আতর আলী মিয়ার ভাতিজা স্বাধীন মিয়া জানান, চাচার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে তার বড় ছেলে যুবলীগ নেতা আল-আমিন দলীয় নেতা মিসবাহ উদ্দিন গংদের হাতে খুন হয়েছেন। এখন যাতে দলীয় মনোনয়ন না চাই, সেজন্য আমাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। এমতাবস্থায় কিভাবে আমরা দলীয় মনোনয়ন চাইবো? দলীয় মনোনয়ন চাইতে গিয়ে আবারও যদি আমাদের পরিবারের কাউকে হারাতে হয়?

তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের এলাকার মানুষ যেখানে আল-আমিনের খুনি মিসবাহ উদ্দিন ভূইয়াকে গ্রেপ্তারের জন্য দাবি জানিয়ে যাচ্ছে, সেখানে আবারও শুনতে পাচ্ছি দল থেকে তাকে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে। তাহলে কিভাবে আমরা দলীয় মনোনয়ন চাইবো, কিভাবে নিরাপত্তা পাবো এ নিয়ে সকলের মধ্যে সংশয় রয়েছে। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে আমাদের পক্ষেই আজমিরীগঞ্জের মানুষ ভোট বিপ্লব ঘটাবেন বলে আমরা আশাবাদী।

উল্লেখ্য, গত ৩০ এপ্রিল আজমিরীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আতর আলী মিয়া মারা যান। নিয়ম অনুযায়ী কোন জনপ্রতিনিধি মৃত্যুবরণ করলে সেখানে উপ-নির্বাচনের কথা রয়েছে। এ হিসেবে গত ১৯ মে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আজমিরীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদটি শূন্য ঘোষণা করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে চিঠি প্রেরণ করে। এর প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন ২৫ জুলাই এ উপজেলায় উপ-নির্বাচনের তারিখ ধার্য করে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে জেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের ৩ জনের নাম প্রস্তাব করে প্রেরণের জন্য বলেন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা আওয়ামী লীগ গত ১৮ জুন দুপুরে উপজেলা পরিষদের হলরুমে এক বর্ধিত সভায় মিলিত হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মিসবাহ উদ্দিন ভূইয়ার সভাপতিত্বে ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার আলীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সভায় উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সভায় মিসবাহ উদ্দিন ভূইয়া, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মর্তুজা হাসান, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আতর আলী মিয়ার ছেলে যুবলীগ নেতা আল-আমিন ও রানা রায় দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে নিজেরা প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। এ সময় মিসবাহ উদ্দিন ভূইয়া এবং আল-আমিনের মাঝে বাকবিতন্ডা হয়। এক পর্যায়ে সভায় হট্টগোল শুরু হলে একাধিক ভাগে বিভক্ত হয়ে নেতাকর্মীরা হামলা-পাল্টা হামলায় জড়িয়ে পড়েন। এ সময় আল-আমিন গুরুতর আহত হলে সাথে সাথে তাকে উদ্ধার করে আজমিরীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আল-আমিনের মৃত্যুতে তার ছোট ভাই আলাউদ্দিন মিয়া মিসবাহ উদ্দিন ভূইয়া, নূরুল হক ভূইয়াসহ ২২ জনকে আসামী করে আজমিরীগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

পাঁচটি ইউনিয়ন পরিষদ ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত আজমিরীগঞ্জ উপজেলা। এ উপজেলায় মোট ৭৯ হাজার ৭৫৩ ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে পুরুষ ৪০ হাজার ৫৩ ও নারী ভোটার ৩৯ হাজার ৭শ’। তবে হালনাগাদ ভোটার তালিকায় আরো ৩/৪ হাজার ভোট বেড়েছে বলে জানা গেছে।

ভাটি এলাকা হিসেবে পরিচিত এ উপজেলার বিগত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতর আলী মিয়া চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এ নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মিসবাহ উদ্দিন ভূইয়া।